শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭

দগদগে ক্ষত নিয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে বদরগঞ্জের ঝাড়–য়ারবিল পদ্মপুকুর স্মৃতিসৌধ

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

বদরগঞ্জ উপজেলা সদর হতে দক্ষিন-পশ্চিম কোনে ছোট দুটি বিল(বড় পুকুর)। নাম ঝাড়–য়ার বিল ও পদ্মপুকুর। এ বিল দুটিতে এক সময় এতটাই পদ্ম ফুল ফুটতো এ কারনে এলাকার মানূষ এ বিলের নামকরন করেন পদ্মপুকুর। দৃষ্টিনন্দন বিল দুটিতে এলাকার লোকজন বিকেলে পায়চারি সহ গোসল করতেন। এই দৃষ্টিনন্দন বিল দুটিতেই ঘটে গেল ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সময়টাতে আশে পাশের এলাকার অসহায় নিরীহ বাঙ্গালীদের একত্রিত করে এই বিল দুটির উপর জড়ো করে চালায় নিষ্টুর নির্যাতন। নির্যাতন চালিয়ে তারা ক্ষান্ত হননি। তারা নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের পাখির মত গুলি করে মেরে এই বিল দুটিতে ফেলে দেয়।
জানা যায়;১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এ দিন পাক হানাদাররা দু’টি ট্রেনে চড়ে রামনাথপুর ইউনিয়নের বালাপাড়া ও কিসমত ঘাটাবিল এলাকার ঝাকুয়াপাড়া গ্রাম সংলগ্ন স্থানে আসে। পাকহানাদাররা রামনাথপুর ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা ঘিরে ফেলে বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় যারা বেঁচে যান তারা প্রাণভয়ে আশ্রয় নেন ঝাড়–য়ারবিল-পদ্মপুকুর পাড়ে। কিন্তু রাজাকাররা ঝাড়–য়ারবিল-পদ্মপুকুর পাড়ে সাধারণ মানুষের আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি টের পেয়ে পাক হানাদারদের জানালে ওই এলাকা ঘিরে ফেলা হয় এবং প্রাণভয়ে লুকিয়ে থাকা মুক্তিকামি নিরীহ বাঙ্গালীকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পাখির মত গুলি করে হত্যা করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতাদের দেয়া তথ্য মতে; সেদিন ওই ঝাড়–য়ারবিল ও পদ্মপুকুর বিলের পাড়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে পাকহানাদাররা।
সে দিনের সেই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজো ভুলতে পারেননি রামনাথপুর ইউনিয়নের লোকজন।
কথা হয় প্রত্যক্ষদর্শি রামকৃষ্ণপুর মাষাণডোবার এলাকার আফজাল হোসেনের সাথে, তিনি জানান; সে সময় আমি বয়সে তরুন ছিলাম। ঝাড়–য়ারবিল-পদ্মপুকুরে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর পাকহানাদাররা বাঁশঝাড়, ফসলের ক্ষেত সবখানে চিরুনি অভিযান চালায়। আমি বাবার সাথে সেদিন বাঁশঝাড়ে লুকিয়েছিলাম। তাদের হাতে অন্যদের সাথে আমিও ধরা পড়ি। সে দিন হয়তো ভাগ্য ভালো ছিল বলেই বেঁচে গেছি। কারণ পাক হানাদাররা রেললাইনের ধারে যুবক, নারী ও বৃদ্ধদের জন্য তিনটি সারি করলে চাদর গায়ে দিয়ে আমি বৃদ্ধের সারিতে দাঁড়াই। পাকবাহিনীর সদস্যরা ওই তিন সারির মধ্যে শুধু যুবকদের ধরে নিয়ে ট্রেনে চড়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়। তাদের ভাগ্যে সেদিন কি ঘটেছে তা আজো জানতে পারিনি।’
বধ্যভূমি সংরক্ষন কমিটির সভাপতি ও সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মেছের উদ্দিন বলেন, ‘পাকসেনারা বাড়িঘরে আগুন দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে সেদিন ঝাড়–য়ারবিল-পদ্মপুকুর পাড়ে ১২শ’ লোককে হত্যা করা হয়।
সরেজমিন এলাকা পরিদর্শনকালে জানা যায়;রামনাথপুর ইউনিয়নের কিসমত ঘাটাবিল, ঘাটাবিল, রামকৃষ্ণপুর, খালিশা হাজীপুর, খোর্দ্দবাগবাড়, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের সরদারপাড়া, বুজরুক হাজিপুর, বুজরুক বাগবাড়ের এমন কোন পাড়া বা বাড়ি নেই যে পাড়ার বা বাড়ির মানুষ সে দিন পাক বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যার শিকার হননি। সে দিনের সেই ভয়াল স্মৃতিকে ধারণ করে ও শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রতিবছর বদরগঞ্জের লোকজন ১৭ এপ্রিলকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করেন। ইতোমধ্যে ঝাড়–য়ার বিল পদ্মপুকুর বধ্যভুমি “স্মৃতিসৌধ” নির্মাণ করা হয়েছে।
এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ঝাড়–য়ার বিল পদ্মপুকুর স্মুতিসৌধ যাওয়ার রাস্তাটি পাকা করা হোক তাহলে স্বাধীনতা পরবর্তী লোকজনরা সহজেই যেতে পারবে এবং জানতে পারবে স্বাধীনতার জন্য তাদের পূর্বপুরুষদের কি মূল্য দিতে হয়েছে। মানুষের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক রাস্তা পাকাকরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক জানান; ঝাড়–য়ার বিল পদ্মপুকুর যাওয়ার রাস্তা পাকা করনের কাজ দ্রুত শুরু হবে।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-৮জানুয়ারি/১৭
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪
 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...