শুক্রবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

“উত্তরাঞ্চলের নীরব ঘাতক গলগন্ড”

                  “উত্তরাঞ্চলের নীরব ঘাতক গলগন্ড”


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

প্রবাদ আছে “জাতের মেয়ে কালো ভালো; নদীর পানি ঘোলাও ভালো”। এলাকা ভিত্তিক এই প্রবাদটি সত্য বলে প্রমানিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রবাদটির তাৎপর্য বাস্তবতার চরম কষাঘাতে অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে তখন মানুষ ভূলে যায় এর মমার্থ।
নীলফামারি ডোমারের এক অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দূর হতে শুশ্রি সুন্দরি মেয়েকে দেখে অবাক হলাম। এই মেয়ের নাকি বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। এ জন্য আত্বীয়ের বাড়ির সবার মন ভীষন খারাপ। খারাপ হওয়ারই কথা। ভাবলাম মেয়ের অন্য কোন সমস্যা আছে তাই হয়তো বিয়ে হচ্ছে না। পরে দেখলাম এবং জানলাম মেয়ের গলায় ছোট ঘ্যাগ বা গলগন্ড এ জন্যই তার আর বিয়ে হচ্ছে না। এটি হল উত্তরাঞ্চলের একটি পরিবারের চিত্র। একটু কষ্ট করে চোখ মেলে তাকালে উত্তরাঞ্চলের এমন অসংখ্য বেদনাদায়ক চিত্র চোখে পড়বে।
গলগন্ড কি?
সহজ কথায় পুরুষ মহিলা বা ছেলে মেয়েদের গলায় একটি বাড়তি মাংস পিন্ডের মতো দেখা যায় একে গলগন্ড বা ঘ্যাগ বলে। গলগন্ড বা ঘ্যাগ হচ্ছে স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বড় হয়ে যাওয়া থাইরয়েড গ্ল্যান্ড। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড আমাদের গলার দু পাশে প্রজাপতির মতো ছড়িয়ে রয়েছে। শরীরে আয়োডিনের পরিমান কমে গেলে যথেষ্ট পরিমান থাইরক্সিন হরমোন তৈরি হয় না। তখন এই অভাব পূরনের লক্ষ্যে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড অতিরিক্ত কাজ করে। ফলে গ্ল্যান্ড বড় হয়ে যায়। কখনো কখনো এই বাড়তি মাংস পিন্ড বড় হয়ে ঝুলে পড়ে; আবার কখনো কখনো এত ছোট থাকে যে সহজে চোখে পড়ে না। বাংলাদেশে সব অঞ্চলে গলগন্ড দেখা যায় তবে উত্তরাঞ্চলে এর প্রকোপ সবচাইতে বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক জরিপ হতে দেখা যায় যে, দেশের ৭০% মানুষের মধ্যে আয়োডিনের অভাব রয়েছে। ১কোটি মানুষ দৃশ্যমান ও প্রায় ৫কোটি মানুষ অদৃশ্যমান গলগন্ড রোগে আক্রান্ত এবং প্রায় ৭লক্ষ মানুষ মারাত্মক শারিরীক ও মানষিক প্রতিবন্ধি।
আয়োডিন এ রোগে কি ভূমিকা রাখে?
আয়োডিন হল এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ। যা শরীরে থাইরক্সিন হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের মাধ্যমে থাইরক্সিন হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন হয়। শরীরের তাপ ও শক্তি রক্ষনাবেক্ষন করার ক্ষেত্রেও  থাইরক্সিন হরমোনের গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রয়েছে। আয়োডিন প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও পানিতে পাওয়া যায়। যেসব উদ্ভিদ ও প্রানি মাটি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমেও আয়োডিন পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতি বছর বৃষ্টিপাত ও বন্যার ফলে মাটি হতে এই আয়োডিন ধুয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের খাদ্যে আযোডিনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যেসব অঞ্চলে মাটি, পানি, শাক-সবজি ও অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যে আয়োডিনের ঘাটতি থাকে সেসব জায়গাতে গলগন্ড রোগ বেশি দেখা যায়।
কারনঃ
গলগন্ড রোগের জন্য খাবারে আয়োডিনের অভাব প্রধান কারন। এছাড়াও কিছু কিছু খাবার আয়োডিন শোষনে বাধা দেয় যেমন মিষ্টি আলু, পোঁয়াজ, বাধাকপি ইত্যাদি। অবশ্য সুমুদ্র পৃষ্ঠ হতে দুরত্ব যত বাড়ে সে অঞ্চলের মাটিতে আয়োডিনের অভাব তত বেশি দেখা যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে কিশোর বয়সে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের আক্রান্ত হবার সম্ভবনা বেশি। এই অবস্থায় শরীরে অবসাদ, ঘুম ঘুম ভাব, চামড়া খসখসে হওয়া ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা নষ্ট হওয়া, কজে অনীহা দেখা দেওয়া, উদ্যম কমে যাওয়া।
বারডেম হাসপাতালের এন্ডক্রাইনোলজি বিভাগের ডাঃ শাহজাদা সেলিমের মতে-আয়োডিনের অভাবে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়। ফলশ্রুতিতে ঠান্ডা সহ্য করার অক্ষমতা, অনিদ্রা, চামড়া শুষ্ক হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রজনন সমস্যাঃ
আয়োডিনের খুব বেশি অভাব দেখা দিলে গর্ভপাত, মৃতসন্তান প্রসব কিংবা অপরিনত শিশুর জন্ম হতে পারে। এই সন্তান বেঁচে থাকলেও জন্মগত নানা সমস্যায় ভোগে।
শিশু মৃত্যুঃ
আয়োডিনের অভাব গ্রস্থ শিশুরা অন্যান্য শিশুদের চেয়ে বেশি মাত্রায় অপুষ্টি জনিত সমস্যায় ভোগে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
আয়োডিনের এই ঘাটতি জনিত সমস্যা দূর করার জন্য আমাদের অবশ্যই দৈনিক খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমান আয়োডিন গ্রহনের মাধ্যমে বিশেষ করে আয়োডিনযুক্ত লবন গ্রহনের মাধ্যমে গলগন্ড এবং আয়োডিনের অভাব জনিত সমস্যা দুর করা সম্ভব। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ, দুধ, শাক-সবজি ও ফল-মূলে প্রচুর পরিমানে আয়োডিন থাকে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল আমাদের দেশে অসংখ্য লবন কোম্পানি আয়োডিনযুক্ত লবন বলে বাজারজাত করছে- কিন্তু বেশীরভাগ লবন কোম্পানির লবনে আয়োডিন নেই।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার ( বিসিক) হিসাব অনুযায়ি দেশে ২৭২টি কোম্পানি আয়োডিনযুক্ত লবন উৎপাদন করছে। তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে বাজারের লবন কোম্পানিগুলোর ৯৫ভাগ লবনেই আয়োডিন নেই।
এমতাবস্থায় আমাদের আয়োডিনের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং ঘরে বসেই আয়োডিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যেমনঃ ভাতের সাথে লবন মিশিয়ে দিয়ে তাতে সামান্য কয়েকফোঁটা লেবুর রস দিলে যদি ভাতের রং বেগুনি হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে লবনে আয়োডিন আছে। স্মরন রাখা প্রয়োজন, আয়োডিনযুক্ত লবনের গুনগত মান ধরে রাখতে অধিক তাপমাত্রা ও স্যাঁতস্যাতে স্থান থেকে দূরে রাখতে হবে।
মোট কথা কোন রোগকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই; এই গলগন্ড হতে অনেক সময় টিউমার ও ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। অতএব “সময় থাকতেই সাবধান”।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...