দয়া করে শতভাগ পাশের লাগাম টেনে ধরুন
কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন “আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিব” বিখ্যাত এই উক্তিটির মর্মার্থ নিঃসন্দেহে শিক্ষা গ্রহনেরই তাগিদ। শিক্ষা জাতির উন্নতির পূর্ব শর্ত। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এগিয়ে যায়; উন্নতির শীর্ষে আরোহন করে। জীবনের পথে শত বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে; জীবনের সাফল্যের দ্বার প্রান্তে যাওয়ার সিঁড়িই হল শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে যোগ্য করে তোলে। নিজের জীবনকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশেষ করে বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত কমবেশি নিরক্ষরতা দূরীকরন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূিচ, উপবৃত্তি প্রদান, স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক ব্যবস্থা শুধুমাত্র শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বপ্নে। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এভাবেই তো ৪৫টি বছর কেটে গেল। আর কতদিন! এভাবে আমাদের সরকারকে ভূর্তুকি দিতে হবে,এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ কর্মসূচি কতটুকুইবা আলোর মুখ দেখেছে তা বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় এসে গেছে বলে মনে করি।
আমাদের দেশে ৩ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। 1) ইংরেজি মিডিয়াম (উচ্চ বিত্তদের জন্য) 2) সাধারন শিক্ষা (মধ্যবিত্তদের জন্য) 3) মাদ্রাসা শিক্ষা (নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রদের জন্য)। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে একই সাথে তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বেশ বেমানান। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে তিন ক্যাটাগরিতে লেখাপড়া করার কারনে তাদের মধ্যে চিন্তা চেতনা ভাবাবেগের বিস্তর ফারাক (ব্যবধান) তৈরি হয়। এটা কখনই দেশের জন্য শুভকর নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটের নিরিখে একটি উদাহরন দেয়া যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে পাকিন্তান ও ভারত নামক দুই দেশের জন্ম। পৃথিবীতে এমনকি কোন দেশ আছে যা শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে জন্ম হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের কারনে পাকিন্তান এবং আমাদের বাংলাদেশ (সাবেক পূর্ব পাকিন্তান)। অথচ দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, মুসলমান প্রধান অঞ্চল হিসাবে ভাগ করে নেওয়ার পরও আজ প্রশ্ন উঠেছে আস্তিক ও নান্তিকতার। (বর্তমানে এই দেশে ৯০ভাগ মুসলমানের বাস) আমার লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। আমি শুধু এতটুকুই জানাতে চাইছি যে, তিন ক্যাটাগরির শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল।
যাক এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। গত ১ দশক হতে লক্ষ্য করছি দেশে যেন শতভাগ পাশের হাওয়া লেগেছে। অবশ্য শতভাগ পাশে যেমন শিক্ষার্থীরা খুশি, তেমন অবিভাবক খুশি, আমাদের সরকারও খুশিতে আত্মহারা। আত্মহারা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত থাকার কারনে আমিও খুশি; তবে খুশিতে আত্মহারা নই। আমার খুশিটা শীতকালে ঠোঁট ফাটার ভয়ে মানুষ যেভাবে হাসে ঠিক তেমনি। আর আমার খুশি না হয়েও উপায় নেই এজন্য যে, প্রতিষ্ঠানে শতভাগের তকমা না লাগলে প্রতিষ্ঠান প্রধান, ম্যানেজিং কমিটি সহ সরকারের পক্ষ থেকে রুটি রুজির হুমকি। সবাই যেন, ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেল সঙ্গীত বাংলার ১০০% লাভ লাভ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
আমার এই লেখা পড়ে হয়তো ভাববেন আমি শিক্ষার্থীদের ঈর্ষনীয় সাফল্যের (শতভাগ) বিরোধি। কথাটা মোটেও সঠিক নয়। আমিও চাই শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শিখে প্রকৃত মানুষ হয়ে আমাদের এই অভাগা জন্মভূমির হাল শক্ত হাতে ধরুক। শুধুমাত্র সস্তা বাহবা কুড়ানো শতভাগ পাশ নয়; আমি চাই সমানসম্মত শতভাগ পাশ। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির শুরুতে এ প্লাস / গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। তা বর্তমানে বেড়ে হাজার পেরিয়ে সংখ্যায় লক্ষ এর দ্বার প্রান্তে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের ফসল তাদের পরীক্ষার ফল। কিন্তু যে পদ্ধতিতে মূল্যায়ন তা নিয়ে আমি সংশয় এড়াতে পারি না। পরীক্ষা কি আজকাল মেধার মূল্যায়ন করে? নাকি কে কত পরীক্ষার খাতার পাতা ভর্তিতে পারদর্শি তা যাচাই করে? তৃনমূল পর্যায়ের একজন শিক্ষক হিসাবে আমার জানতে ইচ্ছা করে হাজার হাজার শিক্ষার্থি সকল বিষয়ে কি তারা সমানভাবে পারদর্শি? এটা কেমন করে হয়!
উপমহাদেশের কিংবদন্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব, হুমায়ুন কবির, সত্যেন বোস, অমর্ত্য সেন, নূরউল ইসলাম, চঞ্চল মজুমদার উনারা কেউই সব বিষয়ে ৮০’র উপরে নম্বর পাননি। (সূত্রঃ সনৎকুমার সাহা;কলামিষ্ট, অর্থনীতিবিদ)
আমার প্রশ্ন হল আজ এত এত ছেলেমেয়ে এই বিরল কৃতিত্ব দেখিয়ে তারপর তারা যাচ্ছে কোথায়? আজকাল প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষায় শতভাগ কিংবা কাছাকাছি পাশ দেখিয়ে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির সুফল ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই সফলতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে আমি নিশ্চিত বেরিয়ে আসবে এর ভিন্ন চিত্র। আমি আরও নিশ্চিত প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষনের ব্যবস্থা করা হলে পাশের হার এ প্লাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যা দাবি করা হয় তা আদৌ সঠিক হবে না।
এ বিষয়ে আমি প্রাথামিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছি তা হল শিক্ষক/পরীক্ষকদের অলিখিত ভাবে নির্দেশ দেয়া হয় প্রাথমিক সেক্টরে বানান ভূল না ধরার জন্য,এবং জমি ভাগের মত অংক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে নম্বর প্রদানের জন্য। আমার জানতে ইচ্ছা করে,যে বাচ্চাগুলো সঠিক/শুদ্ধভাবে বানান, উচ্চারন করতে পারেনা বা পারবে না তারা কলেজে গিয়ে কি কলেজের শিক্ষকগন তাদের বানান ও উচ্চারন শেখাবেন? অনুরূপ কলেজ সেক্টরেও একই ঘটনা। বোর্ড হতে পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগন আনতে গেলে কর্তৃপক্ষ শুরুতেই একটি কথা বলেন,“লিবারেল হবেন”। এ বোর্ড সে বোর্ডের এত পারসেন্টেন্স আর আমাদের এত কম। এই দোহাই দিয়েই পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগনের হাতে তুলে দেন। পূর্বে পরীক্ষার হলে শিক্ষক শিক্ষার্থির অনুপাত ছিল ১৬ঃ১, বর্তমানে তা ২০ঃ১। আবার কোন রুমের কোন শিক্ষার্থি যদি অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার হয় তবে স্ব-স্ব রুমের শিক্ষকরাও বহিষ্কার হবেন। এ হতে কি বুঝা যায়? শিক্ষকরা এমনিতেই অসহায়, এতিম সন্তানের মত। শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয় পত্রিকায় জানান দিয়ে। এ যে কি আত্মসম্মান হানিকর ব্যাপার তা আমি শিক্ষক হিসাবে কাউকে বুঝাতে পারবো না? শিক্ষকরা পরিবার পরিজন নিয়ে এমনিতেই কষ্টে থাকেন, তার উপর তারা পরীক্ষার হলে বহিষ্কার হবার ভয়ে সদা তটস্থ থাকেন। এ যেন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাঁড়ে। শিক্ষকদের এ ভাবে কোনঠাসা,অসম্মান করে কি মানসম্মত শিক্ষা আনায়ন সম্ভব। বছর দুয়েক আগে এস.এস.সি পরীক্ষার ভিজিলেজ টিমের সদস্য হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সৃজনশীল অংশ দেখলাম, তারপর নৈর্ব্যক্তিক অংশ। নৈর্ব্যক্তিক অংশে কোন রুমের আর পরিবেশ রইল না। দেখে ভীষন মর্মাহত হলাম। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে শিক্ষকরা দায়িত্বগত কারনে যতটা না দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ি বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের লেলিহান শিখার মাঝে এক বালতি পানির মত শিক্ষকদের অবস্থা।
এরপর রয়েছে অতি নমনীয় মূল্যায়ন পদ্ধতি। যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অন্তঃসার শূন্য করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় নমনীয়তা প্রকটভাবে লক্ষনীয়। শিক্ষক হিসাবে আমি পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়নের ব্যাপারে পূর্বের সেই (আমাদের যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সময়ে) অবস্থায় ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছি। পূর্ন আঙ্গিঁকে না হলেও ভাবাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে যাওয়া বড়ই প্রয়োজন। তা না হলে ছেলেমেয়েরা তাদের গাফিলতিতে নয় জাতীয় অবহেলার অমার্জনীয় অপরাধে ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে শংকিত বোধ করি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞান সম্মত, গতিশীল, যুগোপযোগি ও বাস্তবমুখি করতে হলে সর্বাঙ্গেঁ প্রয়োজন মেধাবিদের উপযুক্ত বেতনভাতা ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা,এর পাশাপাশি উপবৃত্তি, অবৈতনিক ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরনের সুযোগ এমনভাবে সীমিত করা যাতে দেশ কাঙ্খিত পর্যায়ে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতই যারা শিক্ষার ব্যয় ও পাঠ্যপুস্তক ব্যয় নির্বাহে অক্ষম একমাত্র তারাই এর অন্তর্ভূক্ত থাকবে। আমাদেরকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা শুধুমাত্র শতভাগ পাশ চাই নাকি মানসম্মত পাশ চাই। বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ১৫৫৩ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে সাহিত্যিক টমাস মুরের শিরচ্ছেদের আদেশ হয়। জল্লাদ তার ধারাল তরবারি চালানোর আগে তিনি সময় চাইলেন। তারপর সযতেœ তার বাবরি চুল সরিয়ে বললেন, দেখ এগুলো যেন না কাটে। আমার কাছে মনে হয় সাহিত্যিক টমাস মুর যেমন মৃত্যুদন্ডের আদেশের সাথে রসিকতা করেছেন, তেমনি শতভাগ পাশের তকমা প্রকৃত শিক্ষার সাথে রসিকতা ছাড়া আর কিছুই না।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪
কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন “আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিব” বিখ্যাত এই উক্তিটির মর্মার্থ নিঃসন্দেহে শিক্ষা গ্রহনেরই তাগিদ। শিক্ষা জাতির উন্নতির পূর্ব শর্ত। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এগিয়ে যায়; উন্নতির শীর্ষে আরোহন করে। জীবনের পথে শত বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে; জীবনের সাফল্যের দ্বার প্রান্তে যাওয়ার সিঁড়িই হল শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে যোগ্য করে তোলে। নিজের জীবনকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশেষ করে বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত কমবেশি নিরক্ষরতা দূরীকরন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূিচ, উপবৃত্তি প্রদান, স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক ব্যবস্থা শুধুমাত্র শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বপ্নে। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এভাবেই তো ৪৫টি বছর কেটে গেল। আর কতদিন! এভাবে আমাদের সরকারকে ভূর্তুকি দিতে হবে,এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ কর্মসূচি কতটুকুইবা আলোর মুখ দেখেছে তা বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় এসে গেছে বলে মনে করি।
আমাদের দেশে ৩ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। 1) ইংরেজি মিডিয়াম (উচ্চ বিত্তদের জন্য) 2) সাধারন শিক্ষা (মধ্যবিত্তদের জন্য) 3) মাদ্রাসা শিক্ষা (নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রদের জন্য)। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে একই সাথে তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বেশ বেমানান। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে তিন ক্যাটাগরিতে লেখাপড়া করার কারনে তাদের মধ্যে চিন্তা চেতনা ভাবাবেগের বিস্তর ফারাক (ব্যবধান) তৈরি হয়। এটা কখনই দেশের জন্য শুভকর নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটের নিরিখে একটি উদাহরন দেয়া যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে পাকিন্তান ও ভারত নামক দুই দেশের জন্ম। পৃথিবীতে এমনকি কোন দেশ আছে যা শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে জন্ম হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের কারনে পাকিন্তান এবং আমাদের বাংলাদেশ (সাবেক পূর্ব পাকিন্তান)। অথচ দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, মুসলমান প্রধান অঞ্চল হিসাবে ভাগ করে নেওয়ার পরও আজ প্রশ্ন উঠেছে আস্তিক ও নান্তিকতার। (বর্তমানে এই দেশে ৯০ভাগ মুসলমানের বাস) আমার লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। আমি শুধু এতটুকুই জানাতে চাইছি যে, তিন ক্যাটাগরির শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল।
যাক এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। গত ১ দশক হতে লক্ষ্য করছি দেশে যেন শতভাগ পাশের হাওয়া লেগেছে। অবশ্য শতভাগ পাশে যেমন শিক্ষার্থীরা খুশি, তেমন অবিভাবক খুশি, আমাদের সরকারও খুশিতে আত্মহারা। আত্মহারা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত থাকার কারনে আমিও খুশি; তবে খুশিতে আত্মহারা নই। আমার খুশিটা শীতকালে ঠোঁট ফাটার ভয়ে মানুষ যেভাবে হাসে ঠিক তেমনি। আর আমার খুশি না হয়েও উপায় নেই এজন্য যে, প্রতিষ্ঠানে শতভাগের তকমা না লাগলে প্রতিষ্ঠান প্রধান, ম্যানেজিং কমিটি সহ সরকারের পক্ষ থেকে রুটি রুজির হুমকি। সবাই যেন, ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেল সঙ্গীত বাংলার ১০০% লাভ লাভ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
আমার এই লেখা পড়ে হয়তো ভাববেন আমি শিক্ষার্থীদের ঈর্ষনীয় সাফল্যের (শতভাগ) বিরোধি। কথাটা মোটেও সঠিক নয়। আমিও চাই শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শিখে প্রকৃত মানুষ হয়ে আমাদের এই অভাগা জন্মভূমির হাল শক্ত হাতে ধরুক। শুধুমাত্র সস্তা বাহবা কুড়ানো শতভাগ পাশ নয়; আমি চাই সমানসম্মত শতভাগ পাশ। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির শুরুতে এ প্লাস / গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। তা বর্তমানে বেড়ে হাজার পেরিয়ে সংখ্যায় লক্ষ এর দ্বার প্রান্তে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের ফসল তাদের পরীক্ষার ফল। কিন্তু যে পদ্ধতিতে মূল্যায়ন তা নিয়ে আমি সংশয় এড়াতে পারি না। পরীক্ষা কি আজকাল মেধার মূল্যায়ন করে? নাকি কে কত পরীক্ষার খাতার পাতা ভর্তিতে পারদর্শি তা যাচাই করে? তৃনমূল পর্যায়ের একজন শিক্ষক হিসাবে আমার জানতে ইচ্ছা করে হাজার হাজার শিক্ষার্থি সকল বিষয়ে কি তারা সমানভাবে পারদর্শি? এটা কেমন করে হয়!
উপমহাদেশের কিংবদন্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব, হুমায়ুন কবির, সত্যেন বোস, অমর্ত্য সেন, নূরউল ইসলাম, চঞ্চল মজুমদার উনারা কেউই সব বিষয়ে ৮০’র উপরে নম্বর পাননি। (সূত্রঃ সনৎকুমার সাহা;কলামিষ্ট, অর্থনীতিবিদ)
আমার প্রশ্ন হল আজ এত এত ছেলেমেয়ে এই বিরল কৃতিত্ব দেখিয়ে তারপর তারা যাচ্ছে কোথায়? আজকাল প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষায় শতভাগ কিংবা কাছাকাছি পাশ দেখিয়ে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির সুফল ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই সফলতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে আমি নিশ্চিত বেরিয়ে আসবে এর ভিন্ন চিত্র। আমি আরও নিশ্চিত প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষনের ব্যবস্থা করা হলে পাশের হার এ প্লাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যা দাবি করা হয় তা আদৌ সঠিক হবে না।
এ বিষয়ে আমি প্রাথামিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছি তা হল শিক্ষক/পরীক্ষকদের অলিখিত ভাবে নির্দেশ দেয়া হয় প্রাথমিক সেক্টরে বানান ভূল না ধরার জন্য,এবং জমি ভাগের মত অংক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে নম্বর প্রদানের জন্য। আমার জানতে ইচ্ছা করে,যে বাচ্চাগুলো সঠিক/শুদ্ধভাবে বানান, উচ্চারন করতে পারেনা বা পারবে না তারা কলেজে গিয়ে কি কলেজের শিক্ষকগন তাদের বানান ও উচ্চারন শেখাবেন? অনুরূপ কলেজ সেক্টরেও একই ঘটনা। বোর্ড হতে পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগন আনতে গেলে কর্তৃপক্ষ শুরুতেই একটি কথা বলেন,“লিবারেল হবেন”। এ বোর্ড সে বোর্ডের এত পারসেন্টেন্স আর আমাদের এত কম। এই দোহাই দিয়েই পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগনের হাতে তুলে দেন। পূর্বে পরীক্ষার হলে শিক্ষক শিক্ষার্থির অনুপাত ছিল ১৬ঃ১, বর্তমানে তা ২০ঃ১। আবার কোন রুমের কোন শিক্ষার্থি যদি অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার হয় তবে স্ব-স্ব রুমের শিক্ষকরাও বহিষ্কার হবেন। এ হতে কি বুঝা যায়? শিক্ষকরা এমনিতেই অসহায়, এতিম সন্তানের মত। শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয় পত্রিকায় জানান দিয়ে। এ যে কি আত্মসম্মান হানিকর ব্যাপার তা আমি শিক্ষক হিসাবে কাউকে বুঝাতে পারবো না? শিক্ষকরা পরিবার পরিজন নিয়ে এমনিতেই কষ্টে থাকেন, তার উপর তারা পরীক্ষার হলে বহিষ্কার হবার ভয়ে সদা তটস্থ থাকেন। এ যেন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাঁড়ে। শিক্ষকদের এ ভাবে কোনঠাসা,অসম্মান করে কি মানসম্মত শিক্ষা আনায়ন সম্ভব। বছর দুয়েক আগে এস.এস.সি পরীক্ষার ভিজিলেজ টিমের সদস্য হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সৃজনশীল অংশ দেখলাম, তারপর নৈর্ব্যক্তিক অংশ। নৈর্ব্যক্তিক অংশে কোন রুমের আর পরিবেশ রইল না। দেখে ভীষন মর্মাহত হলাম। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে শিক্ষকরা দায়িত্বগত কারনে যতটা না দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ি বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের লেলিহান শিখার মাঝে এক বালতি পানির মত শিক্ষকদের অবস্থা।
এরপর রয়েছে অতি নমনীয় মূল্যায়ন পদ্ধতি। যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অন্তঃসার শূন্য করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় নমনীয়তা প্রকটভাবে লক্ষনীয়। শিক্ষক হিসাবে আমি পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়নের ব্যাপারে পূর্বের সেই (আমাদের যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সময়ে) অবস্থায় ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছি। পূর্ন আঙ্গিঁকে না হলেও ভাবাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে যাওয়া বড়ই প্রয়োজন। তা না হলে ছেলেমেয়েরা তাদের গাফিলতিতে নয় জাতীয় অবহেলার অমার্জনীয় অপরাধে ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে শংকিত বোধ করি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞান সম্মত, গতিশীল, যুগোপযোগি ও বাস্তবমুখি করতে হলে সর্বাঙ্গেঁ প্রয়োজন মেধাবিদের উপযুক্ত বেতনভাতা ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা,এর পাশাপাশি উপবৃত্তি, অবৈতনিক ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরনের সুযোগ এমনভাবে সীমিত করা যাতে দেশ কাঙ্খিত পর্যায়ে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতই যারা শিক্ষার ব্যয় ও পাঠ্যপুস্তক ব্যয় নির্বাহে অক্ষম একমাত্র তারাই এর অন্তর্ভূক্ত থাকবে। আমাদেরকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা শুধুমাত্র শতভাগ পাশ চাই নাকি মানসম্মত পাশ চাই। বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ১৫৫৩ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে সাহিত্যিক টমাস মুরের শিরচ্ছেদের আদেশ হয়। জল্লাদ তার ধারাল তরবারি চালানোর আগে তিনি সময় চাইলেন। তারপর সযতেœ তার বাবরি চুল সরিয়ে বললেন, দেখ এগুলো যেন না কাটে। আমার কাছে মনে হয় সাহিত্যিক টমাস মুর যেমন মৃত্যুদন্ডের আদেশের সাথে রসিকতা করেছেন, তেমনি শতভাগ পাশের তকমা প্রকৃত শিক্ষার সাথে রসিকতা ছাড়া আর কিছুই না।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন