বুধবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৬

পাট শিল্পের মত কি হারিয়ে যাবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প!!

শ্রমিক অসন্তোষে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি
পাট শিল্পের মত কি হারিয়ে যাবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প!!

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
জীবন মানে গতিশীলতা। জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে আপন ভঙ্গিমায়। জীবনটাকে উপভোগ করছি আমরা সবাই ভিন্ন রঙ্গে ভিন্ন সাজে;এই যা। বেকার দারিদ্রতা হতাশাগ্রস্থ জীবন বিভিষিকাময় দিনগুলিকে পিছনে ফেলে মূলতঃ নিয়তির উপর ভর করেই আদম সন্তানদের রাজধানি শহরে ছুটে আসা। ছুঁটতে ছুঁটতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে হয়ত দেখা যায় শরীরের কোন স্থান হতে লবণ মিশ্রিত লাল পানি মুছে অথবা ঝটপট কোন নোংরা কাপড় দিয়ে আবৃত করে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে আবারো ছুটা। এ যেন দৌড় দৌড় খেলা। এমন চরম বাস্তবতাকে স্বচক্ষে দেখতে গেলে সকাল ৭টা হতে ৮টার মধ্যে রাজধানি শহরের যেকোন রাস্তায় কিংবা গলির দিকে তাকালেই এর সচিত্র সহজেই চোখে পড়বে। রাজধানিতে ছুটে আসা এই সমস্ত দরিদ্র মানুষের ঢল যে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে আসা তাদের আঞ্চলিক কথাবার্তায় সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে মঙ্গাপিড়িত অঞ্চল বলে খ্যাত উত্তরাঞ্চলের মানুষের সংখ্যাই বেশি।
মূল প্রসঙ্গে আসার আগে ছোট বেলার একটি ঘটনা মনের মাঝে উকি দিচ্ছে। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। বৃত্তি ও সমাপনি পরীক্ষার পূর্বে আমার শ্রদ্ধেয় স্যার বাবু হরেন্দ্রনাথ রায় উনি আমাকে পাট রচনা লিখতে না পারার অপরাধে আমার গালে একটা থাপ্পড় বসালেন। পরবর্তীতে যাতে আমাকে আর থাপ্পড় খেতে না হয় এই ভয়ে আমি পাট রচনা মুখস্ত করে স্যারকে লিখে দেই। স্যার তখন আমাকে পরম মমতায় কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললেন আমাদের দেশের মূল চালিকাশক্তি এই সোনালি আঁশ পাট। এই পাট সম্পর্কে না জানলে কি হয়? সেই সময় বুঝিনি মূল চালিকাশক্তি মানে কি? আর আমার মূল চালিকাশক্তির মানে জেনেই বা কি? এখন যখন বুঝলাম তখন সেই সোনালি আঁশ পাট বর্তমানে আমাদের সোনালি অতীত।
আমরা সবাই জানি বাংলাদেশের পাট শিল্পের করুণ পরিণতির জন্য দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র,এই শিল্পের সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তাদের সীমাহীন উদাসিনতাও কম দায়ি ছিল না। এছাড়াও পাট শিল্পের উন্নয়ন,পন্যবৈচিত্র উদ্ভাবন, উৎপাদিত পন্যের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস প্রভূতি বিষয় নিয়ে এই শিল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তা ব্যক্তিগন খুবই উদাসীন ছিলেন। অনেক কিছুর জন্য তারা সরকারের ভূর্তকির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মোট কথা ভূর্তকি এই শিল্পের উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল আমাদের সোনালি আঁশ পাট তথা পাট শিল্প। সাময়িকভাবে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়লেও পাট শিল্পের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের। সেই ১৯৮১ সালে ছোট্ট পরিসরে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে বর্তমানে শতশত গার্মেন্টস শিল্পে রুপ নেয়। বাংলাদেশের এখন মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই শিল্প। কারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ৭০শতাংশ আসে এই খাত হতে। শুরু হতেই যেন এই শিল্পের শনির দশা কাটছে না। হরতাল অবরোধ অসহযোগ রাজনৈতিক অস্থিরতা শ্রমিক অসন্তোষ শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা প্রতি মূহুর্তে ভূ-কম্পনের মত এই শিল্পটির ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। তা না হলে বার বার এই শিল্পের এতো বিপর্যয় কেন? কেনইবা দোষিরা বারবার পার পেয়ে যায়? ফলশ্রুতিতে একের পর এক দূর্ঘটনা ও শ্রমিক অসন্তোষ। সংক্ষেপে এই শিল্পে দূর্ঘটনার বিবরণ সবার জ্ঞাতার্থে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
এক. ১৯৯০ সালে ঢাকা মিরপুরের সারিকা গার্মেন্টস এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৭জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে আহত হয় অনেক শ্রমিক।
দুই. ২০০৫ সালে ৭ জানুয়ারি নারায়নগঞ্জে খান নিমির পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই সালের ১১ এপ্রিল বুধবারে সাভারের বাইপাইলে শাহ্রিয়ার ফেব্রিক্স ও স্পেকট্রাম সোয়েটার কারখানার ৮ম তলা বিশিষ্ট ভবনটি ধ্বসে ৬৫জন শ্রমিক মারা যায়। আহত হয় অনেকে।
তিন. ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের এরিনা কেটিএস টেক্সটাইলে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৬৫ জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে। একই সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ একদিন পরেই তেজগাঁও ফিনিক্স ভবন ধ্বসে ২১ জনের প্রাণহানি ঘটে।
চার. ২০১০ সালে গরিব এন্ড গরিব পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ডে ২২ জন শ্রমিক নিহত হয়। একই সালের ১ জুন রাত ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার বেগুনবাড়ি অঞ্চলের ৪ তলা ভবন পাশের ৩ তলার উপর ধ্বসেপড়ে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হামিম গ্রুপের গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৩০ জন শ্রমিক মারা যায় ২০০ শতাধিক শ্রমিক আহত হয়।
পাঁচ. ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশান নামের পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৫ জন।
ছয়. ২০১৩ সালের সাভারের রানাপ্লাজা ধ্বসে ১১২৭জনের মৃত্যুর ঘটনা ছিল একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা এটা আমরা সবাই জানি।
আমার জানতে ইচ্ছা করে আর কত শ্রমিক এভাবে আত্মহুতি দিবে!! যাদের সস্তা শ্রম, ঘাম আর আত্মদানে যখন দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি হচ্ছে ঠিক তখনই আমাদের শিল্প মালিকরা (কতিপয়) নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রি দিয়ে তাদের মতো করে তৈরি করা ভবনে শ্রমিকদের চরম উৎকন্ঠা আর নিরাপত্তাহীনতার মাঝে ঠেলে দেয়। একবারও কি ভেবে দেখছি এদের নিশ্চিত মৃত্যুর মাঝে ঠেলে দেয়া মানে দেশের অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া।
এ সকল ঘটনার পরপরই ওই সময় বাংলাদেশের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট, জেসিপেনি, এইচ এন্ড এম, বেষ্ট সেলার, টেসকো, লেভিস, জি ষ্টার, লি এন্ড ফং, জিআইজেড সহ বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়ে দিয়েছিলেন হরতাল অবরোধসহ শ্রমিকদের নিশ্চিত নিরাপত্তা দিতে না পারলে তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন (সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন)।
দেশে বিদেশে আলোচনা ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেরিতে হলেও শ্রমিকদের স্বার্থ নিরাপত্তা ও অধিকার সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। তবে শুধু আইন করলেই চলবে না বাস্তবিক অর্থে যথার্থ প্রয়োগও দরকার। মজার ব্যাপার হলো দেশের ৩৪ রপ্তানি পন্যের তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান প্রায় ৮০ শতাংশ। বাকি ৩৩ খাত থেকে রপ্তানি আয় আসে ২০ শতাংশের মতো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইউপিবি)র হিসেবে সর্বশেষ দেখা গেছে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রায় গার্মেন্টসের পরে যেসব খাতের উল্লেখ রয়েছে সে গুলোর অবদান অতি নগন্য।
যেখানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান হরতাল অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি হতে বিরত থাকতে বলেছে, তা না হলে তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন সেখানে ওই সময়ে নতুন করে হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়াটা এই শিল্পের জন্যে কতটা যৌক্তিক ছিল। একদিনের হরতাল অবরোধে এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকা (সূত্রঃ সকালের খবর ৯ জানুয়ারি/১৫) এবং উৎপাদন কমে যায় ৩০-৩৫ শতাংশ। তাহলে সময়ে ওই কয়েকদিনের হরতাল অবরোধে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
সবকিছু কাটিয়ে উঠে যখন বর্তমান সরকার যখন দেশকে স্থিতিশীল ও মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত করছে এই সময়ে আবার নতুন করে গার্মেন্টস্ শ্রমিক অসন্তোষ এবং টানা ৯ দিন ধরে আশুলিয়ার ৫৫ গার্মেন্টস্ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা। দেশের একজন সামান্য নাগরিক হিসেবে এই শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে উৎকন্ঠা বোধ করছি। 
পরিশেষে বলতে চাই,যে শিল্পটি দেশের অর্থনীতির ভিত পোক্ত করছে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির দিকে সেই শিল্পটিকে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। একে বাঁচাতে হলে বাংলাদেশে কখনও কোনদিন কোন রাজনৈতিক দল হরতাল অবরোধ রাজনৈতিক সহিংসতার মত গনবিরোধি কাজ বন্ধ রাখবেন নতুবা গার্মেন্টস শিল্পকে এর আওতামুক্ত রাখা যায় কি না দয়া করে ভেবে দেখবেন এবং সেই সাথে শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারন উৎঘাটন করে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। দেশের স্বার্থে এই শিল্পটিকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২১ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...