শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর বিভাগে আবারও হচ্ছে নীল চাষ

দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর বিভাগে আবারও হচ্ছে নীল চাষ


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর অঞ্চলে আবারও হচ্ছে নীল চাষ। নীল চাষ পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। কিন্তু নীল গাছ দেখেছেন কিংবা চেনেন এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর। এই অপরিচিত গাছই এখন শোভা পাচ্ছে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায়। স্থানিয় ভাষায় এই গাছকে ‘মাল’ বলা হয়। কৃষকরা এখন মূলতঃ জ্বালানি হিসেবে এবং সবুজ সারের ঘাটতি মোকাবেলায় নীল চাষ করছেন। নীল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera tinctoria (ইন্ডিগোফেরা টিংটোরা) এটি Fabaceae (ফাবাসি) গোত্রের গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। পৃথিবীতে নীলের প্রায় ৭৫০টি প্রজাতি রয়েছে। তবে ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি এই গাছ লক্ষ্য করা যায়। এটি সাধারণতঃ রঙ উৎপাদনকারি উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। তবে এই গাছে ওষধি গুণও রয়েছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে নীল চাষ একটি অভিশপ্ত বিয়োগান্তক অধ্যায়। এক সময় বিট্রিশরা জোর করে এ দেশের কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করতো। নীল চাষ না করায় এ দেশের মানুষকে সইতে হত অসহনীয় নির্যাতন। দু’শ বছরের অত্যাচারি নীলকরদের অত্যাচার সইতে না পেরে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। তাদের সেই নির্যাতনের কথা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও আবারও নতুন করে রংপুর বিভাগে নীল চাষ শুরু হয়েছে। সেই নীল এখন এদেশের মানুষকে বিশেষ করে রংপুর বিভাগের হতদরিদ্র নারীদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার সদর উপজেলার মমিনপুর, হরিদেবপুর, পাগলাপীর, তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি, রহিমাপুর, গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি, হরকলি, ঠাকুরপাড়া, সলেয়াশা, খাপড়িখাল, গঞ্জিপুর, চন্দনেরহাট, ধনতোলা, দক্ষিণ পানাপুকুর, লালচাঁদপুর, কচুয়া, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া, গাড়াগ্রাম, বড়ভিটাসহ বেশ কিছু এলাকায় নীল চাষ শুরু হয়েছে। তবে বর্তমানে তা নীল উৎপাদনের লক্ষ্যে নয়। জমিতে সবুজ সার তৈরি এবং জ্বালানীর চাহিদা মেটাতেই এই নীল চাষ। কিন্তু রংপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকায় একটি বে-সরকারি সংস্থা নীলচাষের এই সম্ভাবনাকে এখন কাজে লাগাতে শুরু করেছে। তারা সেখানে ‘নিজেরা কটেজ এন্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে নীল প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিন স্থাপন করে নীলগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে নীল তৈরি করছেন। সংস্থাটির উৎপাদিত নীল বাজারজাত না করে নিজেরাই ব্যবহার করছেন। কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান সুমন্ত বর্মণ জানান; মূলতঃ হতদরিদ্র নারীদের কর্মক্ষম করে তুলতে এই প্রয়াস। কারণ বর্তমানে একটি সংসার একজনের আয়ে চলে না। এ কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন; কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজে ১ হাজার ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনই নারী। এ সব নারীকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে একেক এলাকার দায়িত্ব একেক দলকে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন; নীল বীজ সরবরাহ, পরিচর্যা বাবদ সব খরচই নারীদের দেয়া হয়। এর পর নীলগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ শুরু হলে নারীদের কাছ থেকে ৩টাকা কেজি দরে পাতা কিনে নেয়া হয়। ফলে রাজেন্দ্রপুর এলাকার হতদরিদ্র নারীরা এখন নীলপাতা বিক্রি করে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন; নীল চাষে কোন প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয় না। সাধারণতঃ বছরের চৈত্র মাসে বীজ বপণ করতে হয়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে গাছগুলো শেকড়সহ উপড়ে ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। ১০-১৫দিনের মধ্যে গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে পাতা পঁচে গিয়ে উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি হয়। আর গাছগুলো ব্যবহার হয় জ্বালানি হিসেবে। প্রতি একর জমির নীলগাছ থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এক একর জমিতে নীলচাষ করতে সাধারণতঃ ২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। যার মূল্য মাত্র ৩০-৪০টাকা। যেসব জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না সেসব জমিতে নীল চাষ করা হয়ে থাকে। নীলগাছের পাতা থেকে তৈরি জৈবসার ব্যবহারে সাধারণতঃ আলু, গম,ভুট্টাসহ রবি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কৃষকরা আরও জানিয়েছেন;নীলপাতা এক ধরণের কীটনাশকেরও কাজ করে থাকে। নীলপাতার সবুজসার প্রয়োগ করলে মাটির নীচে ক্ষতিকারক পোকা মাকড় থাকেনা।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন; বৃট্রিশ আমলে রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা নীলকরদের অমানবিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নীলচাষ বন্ধের জন্য আন্দোলন পর্যন্ত করেছেন। আর এখন নিজেদের প্রয়োজনে নীলচাষ করে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। নীলগাছের তৈরি পাতা থেকে সবুজসার ব্যবহার করে কৃষকরা যথেষ্ঠ লাভবান হচ্ছেন। 
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহাবুবর রহমান অন্যান্যদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন; যে জমিতে নীলচাষ করা হয় সে জমিতে সারের ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে ওই জমিতে টিএসপি সারের অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। তিনি বলেন; ফসল উৎপাদনকারি জমিতে নয়; পতিত জমিতে ও রাস্তার দু’পাশে নীলচাষ  করা যেতে পারে।

বদরগঞ্জ রংপুর
তারিখ-২৬ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...