শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

পুস্প ও তার এলোমেলো স্বপ্ন

পুস্প ও তার এলোমেলো স্বপ্ন


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
চারদিক অন্ধকারে ছেঁয়ে গেছে। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। হালকা বর্নিল স্বচ্ছ নীল আকাশটা বুঝি পেয়ে গেছে কোন অশনি সংকেত। এক্ষুনি বুঝি তার ন্যুইয়ে পড়া অসহ্য যন্ত্রনার যবনিকাপাত ঘটাবে অজ¯্র ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে।
এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। তবুও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেল,বুঝতে বাকি রইলো না পুষ্পের। তার এও বুঝতে বাকি রইল না যে, শৈশব কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিয়েছে সে।
বাবা মার রীতিমত উৎকন্ঠা আর দূঃচিন্তা দেখে পুষ্প নিজেকে প্রশ্ন করে সে কি সত্যিই বড় হয়েছে। তার সমবয়সী এক ভাই আছে তাকে নিয়ে তো বাবা মা এত টেনশন করেন না,তবে আমাকে নিয়ে তাদের এত কেন ভাবনা! এক সময় এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় সে। আর ভাবে সে যে নারী।
বাবা মা দাদু ঠাকুমার পীড়াপীড়ি রোধ করতে পারবে পুষ্প, কিন্তু এই ক্ষয়িষ্ণু ধ্বংসপ্রাপ্ত সমাজ ব্যবস্থার প্লাবন রোধ করবে সে কি দিয়ে ? একার কি শক্তি বা সামথ্য আছে যা দিয়ে পুষ্প এই সমাজ ব্যবস্থাটাকে পাল্টে দিতে পারে।
পাখির কিচির মিচির শব্দ আর ভোরের মৃদু সমীরনে শিরশির করে উঠল পুষ্পের শরীর। তৎক্ষনাৎ জেগে উঠলো সে।
চা নাস্তার টেবিলে বসে বাবা মা। এ সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজাটা খুলে দিল পুষ্প। পিয়ন একটা পার্সেল ধরিয়ে দিয়ে স্বাক্ষর নিয়ে বিদায় নিল।
পার্সেল খুলেই নজরে পড়লো বিয়ের কার্ড এবং একটি চিরকুট। কার্ডটি দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল পুষ্প। অবাক হবার কারন হল যে মাসি তার মায়ের চাইতে অনেক ছোট তার একমাত্র মেয়ে কংকন ওর বিয়ে। কংকন সবে মাত্র নবম শ্রেনিতে পড়ে। বিশাল ব্যবসা ওর বাবার। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বিয়ে। বাবা মার এত কিসের দায়,দায় সেরে গেলেই বুঝি বেঁচে যায় বাবা মা।
যথারীতি আয়োজন চলছে বিয়ের। যথাসময়ে পৌছে গেল পুষ্প সহ বাবা মা ভাই। পুষ্প অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়াতে কংকন খুব খুশি হল। কিশোরি কংকন বুঝতে পারছে না যে আজ হতে সে শৃঙ্খলে বন্দি হবে। যে শৃঙ্খল সে কোন দিন ভাঙ্গঁতে পারবে না।
কিছুক্ষন পর মাসিকে জিজ্ঞেস করলাম ছেলেটা(হবু জামাই) কি করে ? মাসি দম্ভের সাথে উত্তর দিল জামাই পিএইচডি করে দেশে এসেছে কংকনকে বিয়ে করে আবার বিদেশে চলে যাবে। ওখানে বড় একটি কোম্পানিতে চাকুরি করে।
মাসির কথা শুনে অবাক হয় পুষ্প।  বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে পিএইচডি করা একটি ছেলের বয়স কমপক্ষে ৩৮। আর কংকনের বয়স বড়জোর ১৪। ব্যবধান অনেক(মূলতঃ গল্পে বয়সের ব্যবধানকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে)। এও কি সম্ভব? মাসিকে জিজ্ঞাসা করলো পুষ্প,এত বয়সের একজন লোকের সাথে তুমি মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছো। মাসি কোন কথার উত্তর দিতে পারলো না,শুধু বুঝলাম নিভৃতে কাঁদছে তার মন।
সময় গড়িয়ে চলল। বর এল। সাত পাক ঘুরে বধুকে মালা পরিয়ে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করলো বাবার বয়সী লোকটা। কংকন উপোষ আছে,বাসি বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মূখে কিছু দেবার যো নেই,এ নিয়ম না মানলে নাকি পতিধনের অমঙ্গল হয় ! সংসারের সূখ পতির দীর্ঘায়ু কামনায় কংকন উপোষ। এ দায় যেন নারীর একার। ফুলের মত মেয়েটি শুকিয়ে গেছে নিঃপ্রভ সলতের মত। সময় তার নিজস্ব গতিতে চলতে লাগলো,বাসি বিয়েও এক হয়ে গেল। এবার বিদায় লগ্ন।
এবার সবাই গাড়িতে উঠছে,তার আগে অবশ্য উঠে গেছে ছেলের বাবার যৌতুক অনুযায়ি প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। কংকনের দু-চোখ বেয়ে ঝরছে অশ্রু। বাবা মাকে ছেড়ে যেতে চাইছে না কংকন। একবার বাবাকে আরেকবার মাকে জড়িয়ে কাঁদছে কংকন। এক প্রকার জোর করেই কারে(গাড়িতে)তোলা হল কংকনকে,আর তার সহযাত্রি হল পুষ্প। সে দেখছে আর ভাবছে একজন অপরিচিত যুবক,যুবক ঠিক নয়,মধ্যবয়সি মানুষের সাথে ঘর করতে হবে কংকনকে আজীবন। সমর্পন করে দিতে হবে তার নারীত্ব। এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই পুষ্পের গহন অতল সমুদ্র হতে ঝরে এল লোনা পানি। রুমাল দিয়ে চোখ মুছলো পুষ্প ।
বরের বাড়ি চলে এল। পুষ্প একে একে গোটা বাড়ি দেখলো। শেষে চোখ পড়লো সুন্দর পরিপাটি একটি রুম তাকে ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে। মনে হল এটিই বাসর ঘর। সত্যিই সূখের বাসর হত যদি দুটি সম-বয়সি নারী পুরুষের মিলন হত। এটাকে নারীত্ব হরনকারি ঘর ছাড়া আর কিছুই মনে হল না পুষ্পের। যথা সময়ে বরাদ্দকৃত ঘর ছেড়ে দেয়া হল নব বর-বধুকে। যা হবার তাই হল।
পরদিন শোরগোলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল পুষ্পের। একজন মাথায় পানি ঢালছে অন্যজন বাতাস করছে। পাশে বসে আছে ডাক্তার আর দূর হতে দেখছে কিংকর্তব্য বিমূঢ় পুষ্প। বেশ কিছুক্ষন পর স্বাভাবিক হল কংকন।
ঘরে বসে পুষ্প আর কংকন। শুধু দু-বোন। কংকন শুধু ফুপিয়ে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলো কংকনকে কি হয়েছে তার ? কংকন কোন কথার উত্তর দিতে পারলো না। শুধু পুষ্পের বুকের মাঝে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। পুষ্প শুধু বুঝতে পারলো,হিং¯্র ক্ষুর্ধাত্ব শিংহের কাছ হতে ক্ষনিকের জন্য মুক্তি পাওয়া হরিন ছানার মায়ের কাছে লুকানোর আকুতি ! কি সাধ্য আছে মা হরিনের,হিং¯্র ক্ষুর্ধাত্ব শিংহের কাছ হতে হরিন ছানাকে বাঁচানোর। কংকনকে শান্ত হতে বললো পুষ্প। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। পুষ্পের মনে হল যেখানে অসহায় নারী, অসহায় তার নারীত্ব, আরও অসহায় এই নারী সমাজ। সেখানে একা পুষ্পের মত মেয়ের কি করার বা বলার আছে ?
পড়ন্ত বিকেলের গোধুলি লগ্নে বাড়ি ছেড়ে রওনা দিল পুষ্প। কাউকে না জানিয়ে। কংকনকেও জানালো না সে। স্বার্থপরের মত চলে এল। এভাবে বেঁচে আছে কংকন নামের হাজারো কংকন। হাজারো কংকন হাজারো রকমের কষ্ট নিয়ে। কারুকার্যময় বাড়ির বেলকোনিতে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে পুষ্প যেন তার কষ্ট ও এলোমেলো ভাবনাগুলোকে আধা ডুবো সূর্যের কাছে সমর্পন করে দিল।

বিঃদ্রঃ কোন ব্যক্তি,সম্প্রদায় অর্থ্যাৎ কাউকে অসন্মান বা হেয় করার জন্য গল্পটি প্রকাশ করা হয়নি। 

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১০ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...