শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

খাদ্য নিরাপত্তা দানকারি কৃষকদের বঞ্চনা করে কি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন সম্ভব !

খাদ্য নিরাপত্তা দানকারি কৃষকদের বঞ্চনা করে কি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন সম্ভব !


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামকগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল নাগরিকদের খাদ্যের নিশ্চিত নিরাপত্তা বিধান করা। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং স্বাধীনতা পরবর্তী এই কাজটিই এখন পর্যন্ত নিরলস ভাবে করে যাচ্ছে আমাদের দেশের ৮০ ভাগ কৃষক। অথচ এই কৃষি তথা নিরক্ষর কৃষককে সব সময় অবজ্ঞা অবহেলা আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির স্বপ্ন দেখিয়ে ভোটের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো সাময়িক ফায়দা হাসিল করতে পারলেও এই কৃষি তথা কৃষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন তো হয়নি বরং তারা আরও হয়েছে নিঃস্ব নিঃপেষিত।এই কৃষি প্রধান দেশে কৃষি তথা কৃষককে নিঃস্ব রুগ্ন করে কিভাবে খাদ্য নিরাপত্তা বিধান সম্ভব? আমাদের সংবিধানের ১৫(ক) ধারায় অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উদ্ধৃত করা আছে। আসলে আমাদের রাষ্ট্র কি সঠিকভাবে এ দায়িত্ব পালন করছে? আমাদের জানতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা কি? খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কি কি সমস্যা এবং কিভাবে এই সমস্যাকে মোকাবেলা করা যায় ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা খাদ্যের নিশ্চিত নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করবো? সহজ সরল ভাষায় খাদ্য নিরাপত্তা হল একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য খাবারের নিশ্চয়তা দেয়া। এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখন কোন পর্যায়ে আছে বিশ্ব খাদ্যসংস্থা,বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট, বিভিন্ন ধরণের গবেষনার ফলাফল, গবেষকসহ দেশ বরেন্য অর্থনীতিবিদদের দেয়া তথ্য অনুযায়ি বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করা যাক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ি এ দেশে ৩১.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে। যারা গড়ে দৈনিক প্রয়োজনীয় ২২০০ কিলোক্যালরি সংগ্রহ করার মতো যথেষ্ট খাবার পায় না। যারা মাথা পিছু ন্যূনতম ১৮০৫ কিলো-ক্যালরি আহারের সংস্থান করতে পারে না তাদেরকে বলা হয় হতদরিদ্র। এরা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ। আবার শহরের তুলনায় গ্রামে হতদরিদ্রের সংখ্যা বেশি। গ্রামে এদের সংখ্যা ২৯ শতাংশ আর শহরে ১৫ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে আঞ্চলিক বৈষম্য। হতদরিদ্রের সংখ্যা বরিশাল বিভাগে (৩৬ শতাংশ), এর পর বৃহত্তর রাজশাহি বিভাগে (৩৫ শতাংশ)।
বিশ্ব খাদ্যকর্মসূচির (ডঋচ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ি জানা যায় বাংলাদেশে ন্যুনতম ক্যালরি না পাওয়া মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ১০ লক্ষ।
তথ্যানুযায়ি গত ১০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। আবাদি জমি কমেছে ৭ শতাংশ। ২০২১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ কোটি ২০ লক্ষ। ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রতিবেদনে যে পূর্বাভাস দেখা হয়েছিল তার উপর ভিত্তি করে বলা যায় ২০৫১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ন্যুনতম ২২ কোটি। এর মধ্যে ১৪ কোটি লোক বাস করবে শহরাঞ্চলে। আবাদি জমির পরিমাণ ভয়াবহ রকমের হ্রাস পাবে। প্রশ্ন হল তখন কিভাবে এদেশের মানুষ খেয়ে পরে বাঁচবে?
এরই মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতা নিয়ে রয়েছে শাসক শ্রেণির ধুম্রজাল, একটি বিশ্লেষণধর্মি তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টিকে মূল্যায়ন করা যাক (সূত্র-মহিউদ্দিন আহমদ, গবেষক) এরশাদ সরকারের আমলে বাংলাদেশ গড়ে প্রতি বছর ১৯ লাখ টন খাদ্য আমদানি করেছিল। খালেদা সরকারের প্রথম পর্বে খাদ্য শস্য আমদানির পরিমাণ বছরে গড়ে ১৭ লাখ টন। হাসিনা সরকারের প্রথম বছরে গড়ে প্রতি বছর আমদানি করেছিলো ২৪ লাখ টন খাদ্য শস্য।দ্বিতীয় পর্বে খালেদা সরকারের বাৎসরিক আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৭ লাখ টন। ফখরুদ্দিন-মইন ইউ আহমেদ সরকারের আমলে বাৎসরিক ২৯ লাখ টন। হাসিনা সরকারের প্রথম পর্বে প্রতি ২ বছরের গড় আমদানি ৩২ লাখ টন। (অবশ্য এই আমদানির হিসাব বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য যোগ করেই),যদিও বর্তমান হাসিনা সরকার খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটাই হল দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতার প্রকৃত চিত্র। যে দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৫০ জন আর চাষযোগ্য ১৪ মিলিয়ন হেক্টর জমির মধ্যে ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর বন্যা, ৫.৫ মিলিয়ন হেক্টর খরা এবং ৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি লবণাক্ত সমস্যায় জর্জরিত এরপরও রয়েছে নদী ভাঙ্গন, নতুন আবাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার, শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য জমির ব্যবহার এবং শহর ও নগরায়ন সম্প্রসারণের ফলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রতি বছর ১.৬ ভাগ হারে কমে যাওয়া; এমন জটিল পরিস্থিতিতেও যদি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পন্যের লাভজনক মূল্য না পায় নিশ্চিতভাবে তারা এক সময় তাদের ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে তা বলাই বাহুল্য।
ধীরে ধীরে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে জনগণ ও সরকারকে এখনই কাজ করতে হবে।
০১.     আমরা সবাই জানি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রধান অন্তরায় হল সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ। এ বিষয়টি সরকার ও জনগণকেই দেখতে হবে যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্বের কয়েক দশকের তুলনায় আমাদের নাগালের মধ্যে।
০২.     এক গবেষনায় দেখা গেছে; উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কাঁচা ফসলের ২০ শতাংশ নষ্ট হয় অথচ আমাদের দেশে ২০ হতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়। অথচ এদেশে যে হারে মানুষ বাড়ছে চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ কমছে ঠিক সেই হারে। আর উৎপাদনের হার তার চাইতেও কম তারপর সংরক্ষণের অভাবে ফসল নষ্টের আশঙ্কা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহাবুব হোসেনের মতে; সীমিত ভূমিতে উদ্ভাবনি কোন পদক্ষেপ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব নয়।
০৩.     জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরেক হুমকি। প্রতিনিয়ত বন্যা, খরা,ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এক্ষেত্রে কৃষি গবেষনা জোরদার করার মাধ্যমে লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত, বন্যা খরা সহিষ্ণু, সময় নিরপেক্ষ ও স্বল্পকালিন উন্নত জাতের খাদ্য শস্যের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্থানিয়ভাবে গবেষনা বাড়াতে হবে।
০৪.     দেশিয় পেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় দূর্ভাবনার যে, বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউটের ১১৫জন বিজ্ঞানি গত দুই দশকে চলে গেছেন এবং এখনও যারা আছেন তাদের বড় একটা অংশ পদোন্নতি বঞ্চনার কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়টি আন্তরিকতার সাথে সরকারকেই দেখতে হবে (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো)। 
একটি রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্র এবং জনগণকে যেমন আন্তরিক হতে হবে তেমনি রাষ্ট্রকে কৃষক ও ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে কৃষি গবেষনা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ব্যবস্থা সমন্বয় সাধনে এবং অঞ্চল ভিত্তিক পানি সম্পদ উন্নয়নে সরকারি খাতে দক্ষতা বাড়াতে হবে; ধান ছাড়াও অন্যান্য সফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হলে ধানের ফলন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত জমি অন্য ফসলে স্থানান্তর, প্রয়োগিক গবেষনা প্রসারের মাধ্যমে অন্যান্য ফসলে উন্নতর প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সরকারি উদ্যোগে শস্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করণের অবকাঠামোর উন্নয়নের দিকে জোর দিতে হবে।
সর্বপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে চাই বড় ধরনের পরিকল্পনা, বিশাল আয়োজন এবং প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি। (যেমন দরকার হলে জনগণকে ধানের পাশাপাশি অন্য খাবারে মনোনিবেশ করা।)
পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয় তা হল মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে দেশের সমৃদ্ধি আনলেও সমৃদ্ধি আসেনি এখনও কৃষকের ঘরে।কৃষকরা উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও অধিকাংশ সময়েই তারা লাভজনক মূল্য হতে বঞ্চিত হয়েছে ফলে তারা অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে প্রতিনিয়ত ঋণ দায়গ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশা। খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দানকারি এই কৃষকদের বঞ্চনা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ কখনোই সম্ভব নয়।        

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখঃ ১৮ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...