জনবল ও আর্থিক দৈন্যদশায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েকামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
বহুদিন ধরে বহু ক্রশ দূরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা .........দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ......একটি শিশির বিন্দু । বিখ্যাত এই কবিতাটির মমার্থ আমরা সবাই জানি ও বুঝি কিন্তু মানতে চাই না। পাক-ভারত উপমহাদেশের একমাত্র রেলওয়ে কারখানাটি স্থাপিত হয়েছে নীলফামারির সৈয়দপুর উপজেলায়। জনবল,আর্থিক দৈন্যদশা ও লোহা চুরির কারনে রেলওয়ে কারখানাটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। যেন দেখার কেউ নেই। অথচ প্রতি বছর সামান্য ভর্তুকিতেই যে পরিমান কোচ ও ওয়াগন তারা সরবরাহ করছে, যদি বাজেট বাড়ানো হয় তাহলে বিদেশ হতে অনেক টাকা খরচ করে কোচ ও ওয়াগন আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন ;কারখানাটির হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে এক্ষুনিই সরকারের সদয় দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এ দিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ে কারখানার এক কর্মচারি জানান; এখানে লোহা চুরির একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লোহা রেলওয়ে কারখানা হতে চুরি হয়ে যায়। এই সিন্ডিকেটে সিবিএ নেতা হতে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জড়িত।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সম্পর্কে জানা যায় ; ১৮৬২ সালে ৫৩.১১কি.মি ব্রডগেজ লাইন দর্শনা হতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত নির্মান করা হয়। ১৮৭০ সালে ছোট মিটারগেজ রেললাইন নির্মান করা হয়। ১৯০৩ সালে ওয়াগন ও বাষ্পচালিত ইঞ্জিন মেরামতের জন্য কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৬ সালে ব্রডগেজ রেললাইনের গাড়ি মেরামতের জন্য সূযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৫৩ সালে ভারি যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে পূন:কার্যক্রম চালু করা হয়। ১৯৬৬ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা বগি ও ওয়াগন নির্মান শপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৮৫ সালে রেলওয়ের বাষ্পচালিত ইঞ্জিন হতে ডিজেল ইঞ্জিনে রুপান্তরিত হয়। ১৯৯৩ সালে কারখানার সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে আধুনিকায়নের মাধ্যমে কারখানার সকল কার্যক্রম চালু করা হয়।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সূত্রে জানা যায় ;১১০একর জমির উপর কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত । নির্মান সামগ্রি রয়েছে ২০একর জমির উপর। চারদিকে দেয়াল ৩০.২৫মিটার। কারখানার ভিতরে মিটারগেজ রেললাইন রয়েছে ২৮.৩১কিমি। ব্রডগেজ রেললাইন ১১.২৫কিমি। ডুয়েলগেজ রেললাইন রয়েছে ২৭.০৮কিমি।
জনবল- মেকানিক্যাল ২৮৪৭ জনের বিপরীতে রয়েছে ১১৪৪জন। ইলেকট্রিক্যাল ৩৩৭জনের বিপরীতে ১৭৫জন। মেডিকেল ১৫৩জনের বিপরীতে ৮৬জন। ওয়ার্কস ৭৫জনের বিপরীতে রয়েছে ৪৬জন। ষ্টোরস্ ৩০৬জনের বিপরীতে ৯৪জন। আরএনবি ১১৩জনের স্থলে ১০১জন। রেলওয়ে ¯ু‹লে ২৫জনের স্থলে ১৮জন। মোট ৩৮৫৬জনের বিপরীতে রয়েছে ১৬৬৪জন। যন্ত্রপতির বয়স-ভারি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ৫০বছরের উপরে বয়স ৩৮৩টির। ২০ হতে ৫০ বছরের মধ্যে বয়স ২০৫টির। ২০বছরের নিচে বয়স ১৫৪টির। মোট ৭৪২টি ভারি যন্ত্র রয়েছে। রেলের খুচরা যন্ত্রাংশের মধ্যে ওয়াগনের যন্ত্রাংশ ২৩৬প্রকারের, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ১২৬প্রকারের। যন্ত্রপাতি ও বিবিধ ২৪৯প্রকারের। মোট ৬১১প্রকার খুচরা যন্ত্রাংশ এই কারখানায় তৈরি হয়। এই কারখানায় মিটারগেজ কোচ ২৩৫টি ব্রডগেজ কোচ ৩২৪টি, মিটারগেজ ওয়াগন ৮১৮২টি, ব্রডগেজ ওয়াগন ২০৫৪টি নির্মান করা সম্ভব।
কোচ ও ওয়াগন সরবরাহ-২০০৯-১০অর্থবছরে এই কারখানাতে মোট ব্রডগেজ কোচ ১৮১টি এবং মিটারগেজ কোচ ৩৯৫টি তৈরি হয়েছে।
২০১০-১১ অর্থবছরে ব্রডগেজ কোচ ২০৬টি, মিটারগেজ কোচ ৪৮৬টি। ২০১১-১২ তে ব্রডগেজ কোচ ৩০২টি, মিটারগেজ কোচ ৬৩০টি। ২০১২-১৩তে ব্রডগেজ কোচ ৩০২টি, মিটারগেজ ৬১১টি। ২০১৩-১৪তে ব্রডগেজ কোচ ২৬৮টি, মিটারগেজ ৫৪২টি। ২০১৪-১৫তে ব্রডগেজ কোচ ৩১০টি, মিটারগেজ ৬৬০টি তৈরি হয়েছে। ২০০৯ হতে ২০১৫ পর্যন্ত ওয়াগন - ব্রডগেজ ২১৯৭, মিটারগেজ ২৮১৩টি। এছাড়াও ২০১৫সালের গত ঈদুল ফিতরে ব্রডগেজ কোচ ৫৯টি, মিটারগেজ কোচ ২৫টি। মোট ৮৪টি কোচ সরবরাহ করে । গত ঈদুল আজহায় ব্রডগেজ কোচ ৪৫টি এবং মিটারগেজ কোচ ২০টি মোট ৬৫টি কোচ এই কারখানা হতে সরবরাহ করা হয়েছিল।
বাজেট প্রাপ্তি ঃ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চাহিদা ১৮কোটি ৫০লক্ষ টাকা। পাওয়া যায় ১৫কোটি ১৯লক্ষ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চাহিদা ১৮কোটি ৭৫লক্ষ টাকা, পাওয়া যায় ১৪কোটি ৬৩লক্ষ টাকা। ২০১০-১১অর্থবছরে ১৮কোটি টাকা পাওয়া গেছে ১৬কোটি ৭৯লক্ষ টাকা। ২০১১-১২তে ১৯কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৭কোটি ৭৪লক্ষ টাকা। ২০১২-১৩তে চাহিদা ২৫কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৯কোটি ৫৮লক্ষ টাকা। ২০১৩-১৪তে চাহিদা ২৮ কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৮কোটি ২৫লক্ষ টাকা। ২০১৪-১৫তে চাহিদা ৩২কোটি ৮৬লক্ষ টাকা পাওয়া যায় ২২কোটি ৪২লক্ষ টাকা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার নির্বাহি প্রকৌশলী মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা জানান ; জনবল সংকট ও বাজেট ঘাটতির কারনে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা কাঙ্খিত উৎপাদনে যেতে পারছে না । অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান; এখন কারখানাতে লোহা চুরি নেই।
সৈযদপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) নূর আহম্মদ জানান; অনেক চেষ্টা করেও চাহিদা অনুযায়ি বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া জনবল সংকটের কারনে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি অনুরোধ করে এই প্রতিবেদককে বলেন ; ভাই একটু লেখালেখি করেন যাতে আমাদের দেশে কোচ ও ওয়াগন বেশি বেশি তৈরি হলে বিদেশ হতে অনেক টাকা খরচ করে কোচ ও ওয়াগন আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৩ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন