শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬

বদরগঞ্জ প্লাটফর্মের একি মনোরম দৃশ্য !

এমন যদি হতো.........
বদরগঞ্জ প্লাটফর্মের একি মনোরম দৃশ্য !


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

বদরগঞ্জ প্লাটফর্মমের পাশেই অঞ্জনদের বাড়ি। সে কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একজন অর্নাস পড়–য়া ছাত্র। প্রতিদিনের মত চোখে মূখে পানি দিয়েই বুধবার ভোর বেলা প্লাটফর্ম মূখে দৌড় দেয়। এসেই দেখে প্লাটফর্মের একি মনোরম দৃশ্য! ভোরের মৃদু সমীরন আর সিগ্ধ কোমল  নির্মল হাওয়ায় ভরে যায় অঞ্জনের মন। বিগত দিনের মত নেই কোন প্লাটফর্মে আর্বজনার স্তুপ, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে বাথরুম, পরিস্কার প্রথম শ্রেনির ওয়েটিং রুম যা এত দিন চোখেই দেখেনি অঞ্জন। সাধারন শ্রেনির বিশ্রামাগারটিও আজ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়েছে। অঞ্জন ভাবে আর ভাবে প্রতিদিন যদি প্লাটফর্মের এমন দৃশ্য দেখা যেত। কৌতুহলি অঞ্জন এবার দু-কদম হেঁটে ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে জানতে চাইল আজ কেন প্লাটফর্ম এত পরিস্কার ঝকঝকে? ষ্টেশন মাষ্টার ব্যস্ততার মাঝেই অনেকটা আড়চোখে উত্তর দিল শুভ নববর্ষ ও রেলের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা ষ্টেশন পরিদর্শনে আসছেন। প্লাটফর্মের ছাদের নিচে ইট শুড়কি আর সিমেন্টের তৈরি উচু বেঞ্চে বসে অঞ্জন মনে মনে ভাবে এভাবে প্রতিদিন কেন শুভ নববর্ষ ও রেলের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা এই স্টেশনে আসেন না !!
খোঁজ নিয়ে জানা গেল; শুভ নববর্ষে রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার খাইরুল আলম বাৎসরিক পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বিশেষ ট্রেনে বিকেলে বদরগঞ্জ রেলওয়ে ষ্টেশন পরিদর্শনে আসবেন তাই এত ঘষামাজা রং করা আর্বজনা পরিস্কার করা।
বদরগঞ্জ রেলওয়ে ষ্টেশন মাষ্টার মাজেদ আলি জানান;নববর্ষ ও আমাদের স্যার আসছেন তাই ষ্টেশন চত্তর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১জানুয়ারি/১৭

কবিতা- নতুন বছর

কবিতা- নতুন বছর

“হিংসা নয়,প্রেম-ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরো
                 ভূল নয় সঠিক পথ বেঁচে নাও।
শত্রু নয় মিত্র হও।
                অতীত নয়
বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে ভাবো,
                  নতুন বছর শুরু হোক
নতুনের খোঁজে 
                 নতুন কিছু কর”


 

কামরুজ্জামান মুক্তা
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-৩১ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৬

রংপুরের সফল মা তহুরা বেগম

রংপুরের সফল মা তহুরা বেগম


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

আমির আলি(৫৫)। পেশায় ভ্যান চালক। বাড়ি বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউপির লালদিঘী শাস্ত্রিপাড়া গ্রামে। ৩ সন্তানসহ তার পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ৫জন। এক সময় গ্রামে রিক্সাভ্যান চালিয়ে সংসারের ব্যয়ভার বহন করা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিলো। বাধ্য হয়ে তিনি বদরগঞ্জ পৌরশহরের শাহাপুর মহল্লার ছকিমুদ্দিনের ডাঙ্গা এলাকায় অন্যের ফাঁকা জমিতে ছোট একটি ঝুপড়ি ঘর তোলেন। এখানে (পৌরশহর) এসেও আমির আলি রিক্সাভ্যান চালিয়ে যখন সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে পারছিলেন না তখন বাধ্য হয়ে আমিরের স্ত্রী তহুরা বেগম(৪৬) অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মি হিসেবে কাজ করে সংসারের হাল ধরেন। আমির দম্পতির ৩ সন্তানই মেধাবি। বড় ছেলে আবু তাহির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো এবং আর্থিক দৈন্যতার কথা ভেবে ঢাকায় টিউশনি করে নিজের ব্যয়ভার বহন ও বাড়িতে টাকা পাঠাতো। পরবর্তীতে ছোট ছেলে মোতালেব হোসেনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সেও টিউশনি করে নিজের ব্যয়ভার বহন সহ বাবা মার কাছে টাকা পাঠাতো। এক সময় বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বের হয়ে বিসিএস করে নির্বাহি ম্যাজিট্রেট হিসেবে যোগদান করেন পাবনা জেলায়। বর্তমানে ছোট ছেলে এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বের হবে। ছোট মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে।
এ দিকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর,মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের তত্বাবধানে সমগ্র দেশব্যাপি পরিচার্লিত“জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ” শীর্ষক বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় সফল জননী হিসেবে  বদরগঞ্জ উপজেলা ও  রংপুর জেলার শ্রেষ্ঠ সফল জননী হিসাবে ক্রেষ্ট ও সন্মাননা পান বদরগঞ্জের শাহাপুর মহল্লার তহুরা বেগম।
সরেজমিনে শাহাপুর মহল্লার ছকিমুিদ্দনের ডাঙ্গা নামক এলাকায় অবস্থিত তার বাড়িতে গেলে সফল জননী তহুরা বেগম জানান; আমার স্বামি আমির আলি রিক্সা ভ্যান চালিয়ে যে রোজগার করতো তা দিয়েও সংসার চলতো না, এর মধ্যে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানো খুবই কষ্ট হত বাধ্য হয়ে আমি অন্যের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করতাম। অনেক পরিশ্রম করেছি সন্তানদের পড়াশুনার জন্য, চেষ্টা করেছি তাদের যেন লেখাপড়া বন্ধ না হয়। তিনি আরও জানান; আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে আবু তাহির নির্বাহি ম্যাজিট্রেট,পাবনায় কর্মরত। ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ হতে এ বছর বের হবে। ছোট মেয়ে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে। সফল জননী হিসাবে স্বীকৃতি পাব ভাবতে পারি নাই।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিমলেন্দু সরকার বলেন; সফল জননী হিসাবে তহুরা বেগম শুধু বদরগঞ্জ উপজেলায় নয় গোটা রংপুর জেলার গৌরব। তার মত মা প্রতিটি পরিবারেই থাকা উচিত। তা হলে দেশ এগিয়ে যাবে।


বদরগঞ্জ রংপুর
তারিখ- ৩১ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল- ০১৭১৭৮৫০৯৬৪  

কবিতা- ভালবাসা

কবিতা- ভালবাসা



“চোখ ভালতো চুলও ভাল
               তার চেয়ে ভাল মন,
তোমার চোখের চাহনিতে গো
               হারাতে কতক্ষন !”



কামরুজ্জামান মুক্তা
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-৩০ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

ছাতার মৌসুমি কারিগর ওরা

ছাতার মৌসুমি কারিগর ওরা

 
কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ


প্রচন্ড তাপদাহ,বর্ষা কিংবা বৃষ্টির আগমনি বার্তা পেলেই রাস্তার ধারে কিংবা দোকানঘরের এক পাশে চট বিছিয়ে সুঁই-সূতা হাতে নিয়েই কাজে লেগে যায় ওরা। প্রচন্ড তাপদাহ,বর্ষা কিংবা বৃষ্টিও তাদের কাবু করতে পারে না।  এমন সময় তারা সুঁই-সূতা চট আর অকেজো ছাতা কোন রকমে মাথায় দিয়ে যবুথবু অবস্থায় ফুটপাতের এক কোনে অবস্থান করে। ওরা আর কেউ নয় ওরা মৌসুমি ছাতা মেরামতের কারিগর। ছিন্নমূল দিনমজুর কিংবা বর্গা-চাষি ধরনের লোকজনরাই একটু বাড়তি আয়ের জন্য ছাতা মেরামতের কাজ করেন। প্রচন্ড তাপদাহ,বর্ষা কিংবা বৃষ্টির যত বেশি ক্রন্দন ততবেশি তাদের আয়। গতকাল শীতের এই মৌসুমে সকালে বৃষ্টির সময় বদরগঞ্জ পৌরশহর ঘুরার সময় দেখা মেলে মৌসুমি ছাতা মেরামতের কারিগর শামিম, নূর ইসলাম ও মোজাম্মেল হোসেনের। এদের সকলের বাড়ি বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
ছাতা মেরামত কারিগর শামিম জানান; সবচাইতে বেশি ছাতা মেরামতের ব্যবসা হয় বর্ষাকালে এবং গ্রীষ্মকালে। এর পর শীতের শুরুতে যখন বৃষ্টি হয় তখন ব্যবসা ভাল হয়। মূলতঃ এই সময়গুলি বাদে আমরা এ ব্যবসা গুটিয়ে কৃষি শ্রমিক হিসেবে ক্ষেতে খামারে কাজ করে বেড়াই।
ছাতা মেরামতের কারিগর নূর ইসলাম জানান;সারা দিনে ছাতা মেরামতের কাজ করে ৪-৫শত টাকা আয় হয়। সে টাকা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে।
কারিগর মোজাম্মেল হোসেন জানান; এই কাজ(ব্যবসা)করার পর বাকি সময়  মানূষের বাড়িতে কামলা(মজুর)দেন। ব্যবসা হতে বাড়তি যা আয় হয় তা দিয়ে বছরের অন্য সময়গুলোতে কোন রকমে জীবন চলে।
ছাতা মেরামত করতে আসা বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারন সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা জানান;অহেতুক সময় নষ্ট না করে এই ব্যবসা দিয়ে বাড়তি আয় করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে তারা কাজ করছে,এটা অবশ্যই ভাল দিক।এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যদি কোন কাজকে ছোট মনে না করে নিরলশভাবে পরিশ্রম করে যায়,তবে দেশ অবশ্যই সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।


বদরগঞ্জ,রংপুর

পূর্বে কাছ থেকে দেখা আমার যমুনা (নদী)

ভ্রমন কাহিনী
পূর্বে কাছ থেকে দেখা আমার যমুনা (নদী)


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
১৯৯৪ সাল। রাজধানি ঢাকা হতে রংপুরে ফেরার পথে বাহাদুরাবাদ ঘাটে এসে ট্রেনের যাত্রিরা যমুনা নদী পারাপারের জন্য ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিলো। বাহাদুরাবাদ ঘাট কর্তৃপক্ষ যাত্রিদের জানিয়ে দিল দুইটি যাত্রিবাহি ফেরি মাঝ নদীতে ডুবোচরে আটকা পড়েছে। নিরুপায় যাত্রিরা বাধ্য হয়ে ছোট ছোট নৌকায় করে নদী পারাপারের সিদ্ধান্ত নিল। এক সময় আমিও বাধ্য হয়ে ছোট একটি নৌকায় অন্যান্যদের সহযাত্রি হলাম। জীবনে এই প্রথম আমি কাছ হতে এত বড় নদী দেখলাম এবং ছোট নৌকায় করে পার হব এটা ভেবেই শংকিত বোধ করছিলাম।
বিকেল ৩টা। ছোট নৌকায় করে যাত্রা শুরু। কিছুদুর পথ যেতে না যেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে,আকাশে তখন কালো মেঘের ঘনঘটা,বুঝলাম হালকা বর্নিল স্বচ্ছ নীল আকাশটা বুঝি পেয়ে গেছে কোন অশনি সংকেত। ভয়ে জড়সড় হয়ে চুপটি করে নৌকার এক কোনে বসে রইলাম। এমনি এক দিনে সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার বাংলাদেশের বড় নদী যমুনা ভ্রমনের।
নদীর উত্তাল তরঙ্গঁ আর শ্যালো নৌকার গুড়গুড় শব্দে আমার হৃদপিন্ড শিহরে উঠেছিলো। কি যে একটা ভীতি আমার মধ্যে কাজ করছিলো ! এ ভীতি আমাকে যেন অক্টোপাসের মত ঘিরে রেখেছে,এখান হতে বেরুবার যেন কোন পথ নেই।
বিস্তৃর্ন জলরাশি,যতদূর চোখ যায় শুধু নদীর উত্তাল তরঙ্গঁই চোখে পড়ে। আকাশ আর নদী যেন মিতালি করেছে অর্থ্যাৎ এক সুরে গাথা। দূর হতে নদীর তীরের নাম না জানা পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছিল এক ঘোমটা পরা বধূ। যে বধু তার প্রিয়জনকেই মূখ দেখানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। নদীর তীরের এই অপরুপ সৌন্দর্য যেন সে একাই উপভোগ করছে।
আর নদীর তীরের মানুষগুলোর জীবন যেন কোন এক রাত্রির স্বপ্নের মত। এই আছে এই নেই। কি বিচিত্রই না জীবন তাদের ! এই সর্বনাশা নদী তাদের জীবনটাকে জিম্মি করে রেখেছে। নদী যেমন তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে অন্যদিকে দিয়েছে তাদের আহার বাসস্থান অর্থ্যাৎ বাঁচার আশ্বাস। এক বুক আশা নিয়ে তারাও বেঁচে আছে। আশা আছে বলেই তো মানুষ বেঁচে থাকে।
দূর হতে দেখা যাচ্ছে ফুলছড়ি ঘাট অর্থ্যাৎ আমাদের গন্তব্যস্থল। পড়ন্ত বিকেলের গোধুলি লগ্নে আমরা ধরনীর বুকে উত্তাল নদী পেরিয়ে হয়তঃ এক সময় উপস্থিত হব আমাদের গন্তব্যস্থলে। পিছনে পড়ে থাকবে কিছু আবেগতাড়িত মূহুর্ত কিছু স্মৃতি। আমার হয়তঃ আজই এ পথে চলার শেষ। কিন্তু নদীর তীরের মানুষদের। পৃথিবীর বুকে যতদিন সূর্য উদিত হবে যতদিন সূর্য অস্তমিত হবে ততদিন তাদের এ উত্তাল নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করতেই হবে। দেখা যাবে একদিন তারা কা¬ন্ত নিঃস্তেজ হয়ে যাবে,আবার সজীব হয়ে বেড়িয়ে পড়বে জীবিকার সন্ধানে। এ চলার যেন শেষ নেই। এ যেন এক অফুরন্ত পথ।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৯ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

Poem তুমি আমার

               তুমি আমার


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

তুমি আমার শীতের সকাল
                 শীতের শিশির বিন্দু,
তোমার পরশে হৃদয় আমার
                 হয়ে যায় সিন্ধু(বিশাল)।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৮ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

হতদরিদ্র ছুরুত আলির বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

হতদরিদ্র ছুরুত আলির বদলে যাওয়া জীবনের গল্প
কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

ছুরুত আলি একজন হতদরিদ্র রিক্সা চালকের নাম। জীবন জীবিকার তাগিদে রিক্সার শক্ত হ্যান্ডেলকে সঙ্গী করে প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে নেমে পড়তেন। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৭। রিক্সা চালিয়ে সংসারে সাত সদস্যের ব্যয়ভার ভরনপোষন তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। নিরুপায় ছুরুত আলি সেই ভোরে রিক্সা নিয়ে বের হতেন আর বাড়ি ফিরতেন রাত ১২ টার দিকে।রিক্সা চালিয়ে যে টাকা উপার্জন করতেন তা দিয়ে ঠিকমত সংসার চলতো না। মাঝে মাঝে হতদরিদ্র ছুরুত আলির পরিবারকে অর্ভুক্ত থাকতে হতো।
একদিন এক রিক্সার প্যাসেঞ্জার কলেজ শিক্ষকের পরামর্শে তিনি রিক্সা চালানো ছেড়ে দিয়ে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন সবজি চাষ। আর এই সবজি চাষই তার জীবনকে বদলে দিল। এখন তাকে আর রিক্সা চালাতে হয় না। সবজি চাষ করে ছুরুত আলি এখন স্বাবলম্বি। বদলে যাওয়া ছুরুত আলির বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ পৌর শহরের চাঁদকুটি ডাঙ্গা মহল্লায়।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়; ছুরুত আলি কপি ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন।  সফল সবজি চাষি ছুরুত আলি জানান; গতবছর তিনি শ্যাম এন্ড মম লোহানি মেডিকেল সেন্টারের ২ একর ৩০ শতক জমি বর্গা নিয়ে বাঁধা কপি ও ফুল কপির চাষ করেছিলেন। যাবতীয় খরচ বাদে তিনি আয় করেছিলেন ১ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা। এবার তিনি অন্যের আরও চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে কপি ও লাউয়ের চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত সার,বীজ, কীটনাশক,সেচ ও পরিচর্যায় তার খরচ হয়েছে ১ লক্ষ টাকা। তিনি আশা করছেন সব মিলিয়ে ওই সকল জমি হতে তিনি দুই-তিন লাখ টাকা আয় করতে পারবেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে; সবজি চাষ করে তিনি ইতোমধ্যে এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। নিজস্ব দালানবাড়ি করেছেন। ছোট করে গরুর খামার দিয়েছেন। তার অন্য সন্তানদের তিনি লেখাপড়া করাচ্ছেন।
স্ত্রী রহিমা বেগম জানান; আগে কতদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। আল্লাহ্র রহমতে এখন আমরা অনেক ভাল আছি।
বর্তমানে সফল সবজি চাষি ছুরুত আলি জানান; দেশের যুবকরা যদি অহেতুক সময় নষ্ট না করে কৃষি কাজে মনোযোগি হয় এবং একটু পরিশ্রম করেন তাহলে তারাও কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারবে। বিষয়টি আমি নিজেকে দিয়েই বুঝতে পেরেছি।
বদরগঞ্জ উপজেলা সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় জানান; ছুরুত আলি একজন সফল সবজি চাষি। তিনি শুধুমাত্র সবজি চাষ করেই স্বাবলম্বি হয়েছেন। আমরা সব সময় তাকে সবজি চাষে উৎসাহিত করে আসছি।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৮ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

কৃষি বিপ্লবের আরেক নাম সোলার ইরিগেশন পাম্প

কৃষি বিপ্লবের আরেক নাম সোলার ইরিগেশন পাম্প


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

রক্ত বর্নের ন্যায় লাল মাটি। শুস্ক মৌসুমে এ অঞ্চলের মাটি হয়ে যায় ইটের মত। পানির অভাবে বছরের পর বছর শত শত একর জমি অনাবাদি(পরিত্যক্ত) পড়ে থাকে। ছোট বেলা হতে দেখছি আমাদের জমির এই অবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের এখানকার কৃষকরা বউ বাচ্চা নিয়ে বাঁচার আশায় নানা ধরনের সমস্যার মধ্যেও শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ কাজ পরিচালনা করতো। গত বছর হতে সোলার ইরিগেশন পাম্প সেচ কাজে ব্যবহার করে এখানকার শত শত একর পরিত্যক্ত জমি কৃষকরা নানা ধরনের ফসল ফলিয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। আবেগ তাড়িত হয়ে কথাগুলো বললেন বদরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী পার-খাগড়াবন্দ এলাকার প্রবীন কৃষক মজনু শাহ্(৭২)।
রংপুরের বদরগঞ্জে কৃষি কাজে বিপ্লব ঘটিয়েছে সোলার ইরিগেশন পাম্প। গত বছর ৫১টি সোলার পাম্পের মাধ্যমে স্বল্প খরচে উপজেলার ৯ ইউনিয়নে ১ হাজার একর জমিতে ইরি-বোরো চাষাবাদ করা হয়েছিল। ডিজেলের চেয়ে খরচ কম হওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষকরা বর্তমানে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বিকল্প সেচ ব্যবস্থা সোলার পাম্পের উপর। 

জানা যায়; উপজেলার বিঞ্চুপুর, লোহানিপাড়া, কালুপাড়া, মধুপুর, রামনাথপুর, রাধানগর, গোপিনাথপুর, কুতুবপুর ও গোপালপুর ইউনিয়নের যে সব এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি ওইসব এলাকায় সোলার পাম্পের মাধ্যমে চাষাবাদ করে কৃষকদের  খরচ ও সময় দুটোই সাশ্রয় হয়েছিল। সেইসাথে ভরা মৌসুমের হয়রানি থেকেও রেহাই পেয়েছিলেন এলাকার কৃষকরা। এ কারনে চলতি মৌসুমে কৃষকরা বিকল্প সেচ ব্যবস্থা হিসেবে সোলার পাম্পকেই তারা বন্ধু হিসেবে বেঁচে নিয়েছেন। 
গতকাল মঙ্গলবার (২৭ডিসেম্বর)) উপজেলার বিঞ্চুপুর ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় ওসমানপুর দলুয়া গ্রামের কৃষক আতাউর রহমানের সাথে,তিনি জানান;যেখানে এক একর জমিতে ডিজেল চালিত স্যালোমেশিন দিয়ে চাষাবাদ করতে খরচ হয় ১০ হাজার টাকা। সেখানে সোলার পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিতে আমাদের খরচ হচ্ছে ৬ হাজার টাকা। এ ছাড়াও  লোকবল ও স্যালো মেশিনের কোন ঝুটঝামেলা নেই।
কৃষক ফিরোজ মানিক জানান; গত বছর থেকে সোলার পাম্পের মাধ্যমে আমি ৩ একর জমি চাষাবাদ করে আসছি। আমার জমিতে কোন বিদ্যুতের সংযোগ নাই, কবে নাগাদ বিদ্যৃৎ সংযোগ দেয়া হবে সেটাও অনিশ্চিত। তাই আমরা এই অঞ্চলের কৃষকরা এখন সোলার পাম্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। তিনি আরও বলেন; আমাদের এই অঞ্চলে এক সময় প্রয়োজনীয় পানির অভাবে একেবারেই চাষাবাদ হতো না। সোলার পাম্প আমাদের সেই অভাব পুরণ করেছে। শুধু ইরি-বোরো চাষাবাদ নয়, এই পাম্পের মাধ্যমে আমরা সারা বছর সব ধরনের ফসলের চাষ করে আসছি।
কথা হয় সোনারগাঁও লিমিটেড সোলার ইরিগেশনের বদরগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্বরত জেনারেল ম্যানেজার আশরাফুল আলম সুমন বলেন; গত বছর উপজেলায় ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়নেই ১ হাজার একর জমিতে সোলার ইরিগেশন পাম্পের মাধ্যমে সেচ প্রদান করা হয়েছিল। ব্যাটারি ব্যাক-আপ না থাকায় শুধু দিনের বেলায় সেচ পাম্প চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মেঘলা দিনে দু-দিন পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা না গেলেও আবহাওয়া যদি অনুকুলে থাকে তাহলে সোলার পাম্পে তেমন কোন সমস্যা হয় না।  চলতি বছর আর ১টি ইউনিয়ন এই সেচ ব্যবস্থার আওতায় আসবে বলে তিনি আশা পোষন করছেন।
সোনারগাঁও লিমিটেড সোলার ইরিগেশনের বদরগঞ্জ উপজেলা পরিচালক সামছুল আলম স্বপন জানান;বদরগঞ্জ উপজেলায় কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে সোলার ইরিগেশন পাম্প। 

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুবর রহমান জানান; যে সব এলাকায় বিদ্যুৎ নেই সেইসব এলাকায় বিকল্প সেচ হিসেবে সোলার ইরিগেশন পাম্প গুরত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করছে।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৭ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪            

সোমবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

কবিতা বিদায়-২০১৬

কবিতা
বিদায়-২০১৬


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

“চলেই যখন যাবে তুমি
      একটু ফিরে চাও
আমার ভালবাসাটুকু
      ফেরৎ দিয়ে যাও”।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৬ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

বদরগঞ্জের হাসান আল মাহমুদ একজন সফল খামারি

বদরগঞ্জের হাসান আল মাহমুদ একজন সফল খামারি 

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

গ্রাজুয়েশন শেষ করে প্রতিটি মানুষ যখন জীবন জীবিকার তাগিদে চাকুরি নামক সোনার হরিনের দিকে ছুটতে থাকে অভিভাবকরাও তখন সন্তানের ভবিষ্যতের ভাবনায় চিন্তিত হয়ে পড়ে। কখন তার সন্তান ভাল একটা চাকুরি পায়। ভাল উপার্জন করে। অভিভাবকদের ভাবনা আর সন্তানের ভাবনার মিল না হলে শুরু হয় বিপত্তি। পরিবারের শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সফলতার চুড়ান্ত সীমায় পৌছানো এক মানুষের নাম হাসান আল মাহমুদ। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের ঝাকুয়াপাড়া নামক গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের তার জন্ম। তার পিতার নাম মফলে উদ্দিন প্রাং(মফলে গোমস্তা)। ১৪ ভাই বোন। ১৪ ভাই বোনই কম-বেশি উচ্চ শিক্ষিত। সবার ছোট হাসান আল মাহমুদ। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও স্বাবলম্বি হবার নেশায় প্রায় এক যুগ আগে মাত্র ২৫ শতকের পুকুর দিয়ে শুরু করলেন মাছ চাষ। তাতে সফল হলেন। ধীরে ধীরে পুকুরের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। বর্তমানে তার পুকুর রয়েছে ১৫টি। সেখানে তেলাপিয়া, দেশি মাগুর,শিং, কাতলা অর্থ্যাৎ কার্প জাতীয় মাছের চাষ করেন। পুকুর পাড়ের এক দিকে গরু মোটাতাজা করনের খামার অন্য দিকে মুরগির খামার। তার গরুর খামারে ৩৫টি গরু রয়েছে। মুরগির খামারে রয়েছে ৫হাজার বয়লার মুরগি। এখানেই তিনি থেমে নেই শুরু করলেন আম ও লিচুর বাগান। তার বাগানে হাড়িভাঙ্গা জাতের ১২ শত গাছ আছে। লিচু গাছ আছে ৩৫০টি। গত বছর(৬ বছর বয়সি) আম বাগান হতে তিনি আয় করেছেন প্রায় ১২ লাখ টাকা। সব কিছূ মিলে তার মাসিক উপার্জন ৩ লাখ টাকা। সফল মাছ চাষি হিসাবে তিনি উপজেলায় ২০০৫ ২০০৯ ও ২০১২ সালে শ্রেষ্ঠ মাছ চাষি হিসাবে পদক পেয়েছেন।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ও মৎস্য খামারি বিমলেন্দু সরকার জানান;সফল খামারি হাসান বদরগঞ্জের পথিকৃত। তাকে অনুকরন করে আজ বদরগঞ্জে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের খামার গড়তে অনুপ্রেরনা পেয়েছে।
কথা হয় সফল চার্ষি হাসান আল মাহমুদের সাথে তিনি জানান; লেখাপড়া শেষে চাকুিরর পিছনে না ছূটে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নেশায় আজকের এই অবস্থানে এসেছি। ভাবতে ভাল লাগে নিজে স্বাবলম্বি হবার পাশাপাশি ৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিষয়টি। দারিদ্র বিমোচন ও গ্রামিন অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও অংশ গ্রহন করতে পেরে আমি আনন্দিত। তিনি আরও জানান; যুব উন্নয়ন বলেন আর কৃষি অফিস বলেন বাস্তবে আমাকে কোন সহযোগিতা করেনি।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৬ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪
    

শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর বিভাগে আবারও হচ্ছে নীল চাষ

দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর বিভাগে আবারও হচ্ছে নীল চাষ


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
দগদগে ক্ষত কাটিয়ে রংপুর অঞ্চলে আবারও হচ্ছে নীল চাষ। নীল চাষ পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। কিন্তু নীল গাছ দেখেছেন কিংবা চেনেন এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর। এই অপরিচিত গাছই এখন শোভা পাচ্ছে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায়। স্থানিয় ভাষায় এই গাছকে ‘মাল’ বলা হয়। কৃষকরা এখন মূলতঃ জ্বালানি হিসেবে এবং সবুজ সারের ঘাটতি মোকাবেলায় নীল চাষ করছেন। নীল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera tinctoria (ইন্ডিগোফেরা টিংটোরা) এটি Fabaceae (ফাবাসি) গোত্রের গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। পৃথিবীতে নীলের প্রায় ৭৫০টি প্রজাতি রয়েছে। তবে ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি এই গাছ লক্ষ্য করা যায়। এটি সাধারণতঃ রঙ উৎপাদনকারি উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। তবে এই গাছে ওষধি গুণও রয়েছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে নীল চাষ একটি অভিশপ্ত বিয়োগান্তক অধ্যায়। এক সময় বিট্রিশরা জোর করে এ দেশের কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করতো। নীল চাষ না করায় এ দেশের মানুষকে সইতে হত অসহনীয় নির্যাতন। দু’শ বছরের অত্যাচারি নীলকরদের অত্যাচার সইতে না পেরে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। তাদের সেই নির্যাতনের কথা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও আবারও নতুন করে রংপুর বিভাগে নীল চাষ শুরু হয়েছে। সেই নীল এখন এদেশের মানুষকে বিশেষ করে রংপুর বিভাগের হতদরিদ্র নারীদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার সদর উপজেলার মমিনপুর, হরিদেবপুর, পাগলাপীর, তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি, রহিমাপুর, গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি, হরকলি, ঠাকুরপাড়া, সলেয়াশা, খাপড়িখাল, গঞ্জিপুর, চন্দনেরহাট, ধনতোলা, দক্ষিণ পানাপুকুর, লালচাঁদপুর, কচুয়া, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া, গাড়াগ্রাম, বড়ভিটাসহ বেশ কিছু এলাকায় নীল চাষ শুরু হয়েছে। তবে বর্তমানে তা নীল উৎপাদনের লক্ষ্যে নয়। জমিতে সবুজ সার তৈরি এবং জ্বালানীর চাহিদা মেটাতেই এই নীল চাষ। কিন্তু রংপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকায় একটি বে-সরকারি সংস্থা নীলচাষের এই সম্ভাবনাকে এখন কাজে লাগাতে শুরু করেছে। তারা সেখানে ‘নিজেরা কটেজ এন্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে নীল প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিন স্থাপন করে নীলগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে নীল তৈরি করছেন। সংস্থাটির উৎপাদিত নীল বাজারজাত না করে নিজেরাই ব্যবহার করছেন। কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান সুমন্ত বর্মণ জানান; মূলতঃ হতদরিদ্র নারীদের কর্মক্ষম করে তুলতে এই প্রয়াস। কারণ বর্তমানে একটি সংসার একজনের আয়ে চলে না। এ কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন; কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজে ১ হাজার ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনই নারী। এ সব নারীকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে একেক এলাকার দায়িত্ব একেক দলকে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন; নীল বীজ সরবরাহ, পরিচর্যা বাবদ সব খরচই নারীদের দেয়া হয়। এর পর নীলগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ শুরু হলে নারীদের কাছ থেকে ৩টাকা কেজি দরে পাতা কিনে নেয়া হয়। ফলে রাজেন্দ্রপুর এলাকার হতদরিদ্র নারীরা এখন নীলপাতা বিক্রি করে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন; নীল চাষে কোন প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয় না। সাধারণতঃ বছরের চৈত্র মাসে বীজ বপণ করতে হয়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে গাছগুলো শেকড়সহ উপড়ে ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। ১০-১৫দিনের মধ্যে গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে পাতা পঁচে গিয়ে উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি হয়। আর গাছগুলো ব্যবহার হয় জ্বালানি হিসেবে। প্রতি একর জমির নীলগাছ থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এক একর জমিতে নীলচাষ করতে সাধারণতঃ ২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। যার মূল্য মাত্র ৩০-৪০টাকা। যেসব জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না সেসব জমিতে নীল চাষ করা হয়ে থাকে। নীলগাছের পাতা থেকে তৈরি জৈবসার ব্যবহারে সাধারণতঃ আলু, গম,ভুট্টাসহ রবি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কৃষকরা আরও জানিয়েছেন;নীলপাতা এক ধরণের কীটনাশকেরও কাজ করে থাকে। নীলপাতার সবুজসার প্রয়োগ করলে মাটির নীচে ক্ষতিকারক পোকা মাকড় থাকেনা।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন; বৃট্রিশ আমলে রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা নীলকরদের অমানবিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নীলচাষ বন্ধের জন্য আন্দোলন পর্যন্ত করেছেন। আর এখন নিজেদের প্রয়োজনে নীলচাষ করে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। নীলগাছের তৈরি পাতা থেকে সবুজসার ব্যবহার করে কৃষকরা যথেষ্ঠ লাভবান হচ্ছেন। 
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহাবুবর রহমান অন্যান্যদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন; যে জমিতে নীলচাষ করা হয় সে জমিতে সারের ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে ওই জমিতে টিএসপি সারের অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। তিনি বলেন; ফসল উৎপাদনকারি জমিতে নয়; পতিত জমিতে ও রাস্তার দু’পাশে নীলচাষ  করা যেতে পারে।

বদরগঞ্জ রংপুর
তারিখ-২৬ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

আমের বাগানে ঘাস চাষ,সচ্ছল হচ্ছেন কৃষকরা

আমের বাগানে ঘাস চাষ,সচ্ছল হচ্ছেন কৃষকরা

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

মিশুক ও আড্ডাবাজ এক যুবকের নাম মফিজুল হক(৩৫)। এক সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়াই যার ছিল প্রধান কাজ। সেই মানুষটিই আজ উপজেলার একজন সফল চাষি। পিতার মৃত্যুই তার জীবনের গতি বদলে দিয়েছে। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের মৃত শহিদুল হকের ছোট সন্তান মফিজুল হক। পিতা মাতার দশ সন্তানের মধ্যে মফিজুল সর্বকনিষ্ঠ। পিতার মৃত্যুর পর গ্র্যাজুয়েশন করা মফিজুল কৃষি কাজে মনোনিবেশ করে তার শ্রম মেধা ও প্রজ্ঞায় সে প্রতিটি মৌসুমের প্রতিটি ফসলেই আশানুরুপ ফলন পায়। একে একে গরু পালন মাছ চাষ বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ হতে শুরু করে সব কিছূই চাষাবাদ করতে থাকে বছর শেষে হিসেব কষে লক্ষ টাকা আয়ও করে সে। বছর দুইয়েক আগে তাদের বালু মিশ্রিত পরিত্যক্ত দুই বিঘা(৬০ শতাংশে বিঘা) জমিতে আমের বাগান করে এবং আমের বাগানের ফাঁকে সে নেপিয়ার জাতের ঘাস আবাদ করে।
সরেজমিনে তার আমের বাগান ঘুরতে গেলে দেখা যায় আমের ছোট ছোট গাছের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন এবং তা বিক্রিও করছেন। গতবছর তার আম বাগানে প্রচুর আমও ধরেছিলো,আম বিক্রি করেছিলেন অর্ধলক্ষ টাকার। 
আম বাগান মালিক মফিজুল হক জানান; অযথা সময় নষ্ট না করে সকলের নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করা উচিত,তাতে নিজে সচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি দেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। তিনি আরও জানান;এ পর্যন্ত নেপিয়ার ঘাস বিক্রি করেছি ৫০ হাজার টাকার মত।
বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আফজাল হোসেন প্রামানিক জানান; মফিজুল আমার চাচাতো ভাইয়ের ছোট ছেলে। তাকে নিয়ে আমরা এক সময় চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম ও কি করে খাবে ? আমার ভাল লাগছে সে এখন উপজেলার সফল চাষি। 
উপজেলা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় জানান; মফিজুলের পিতা উপজেলার বড় গৃহস্থ। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কৃষিতে এত বেশি সফলতা পাবে ভাবতেই অবাক লাগে। আধুনিক যুগোপযোগি চেতনাই তাকে সফলতার দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে।

বদরগঞ্জ, রংপুর।
তারিখ-২৪ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল- ০১৭১৭৮৫০৯৬৪



         

শিশু শ্রম ও রাজধানি ঢাকা

শিশু শ্রম ও রাজধানি ঢাকা


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
জীবন মানে গতিশীলতা,থেমে থাকা তার কাছে যেন দ্যর্থহীন কোন বাসনা। জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে আপন ভঙ্গিমায়। জীবনটাকে উপভোগ করছি আমরা সবাই ভিন্ন রঙ্গে ভিন্ন সাজে এই যা ! সবাই তো আর এক ভাবে জীবনটাকে উপভোগ করে না আর করতে পারেও না। এ জীবনে কতইনা উত্থান কতইনা পতন। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও সে যেন চলে ঘড়ির কাটার মত টিক টিক করে।
আমি আজ সেই জীবনের কথা বলবো যেখানে আছে শুধু গতিশীলতা,নেই কোন বিনোদনের লেশ মাত্র উপকরন। বেকার দারিদ্রতা হতাশাগ্রস্থ জীবন আর বিভিষিকাময় দিনগুলিকে পিছনে ফেলে মূলতঃ নিয়তির উপর ভর করে আদম সন্তানদের রাজধানি শহরে ছুঁটে আসা।
ছুঁটতে ছুঁটতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে হয়তঃ শরীরের কোন স্থান হতে লবন মিশ্রিত লাল পানি মুছে অথবা ঝটপট নোংড়া কাপড় দিয়ে আবৃত করে ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে আবারো ছুঁটা। এ যেন দৌঁড় দৌঁড় খেলা।
এমন চরম বাস্তবতাকে স্বচক্ষে দেখতে গেলে সকাল ৭টা হতে ৮টার মধ্যে রাজধানির যে কোন রাস্তায় কিংবা গলির দিকে তাকালে এর সচিত্র সহজেই চোখে পড়বে। ছোট বড় কমবয়সি মধ্যবয়সি সব ধরনের লোকজন অর্থাৎ যাকে বলি আবালবৃদ্ধবনিতা। তবে এদের মধ্যে সহজেই দৃষ্টি কাড়ে কোমলমতি শিশুদের। যাদের কোমল হাত প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে জীবিকার কষাঘাতে। এ সব দেখে আবেগে আপ্লুত হয় মন। ঘৃনা ক্ষোভ আর লজ্জা যেন আমার ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে যাতাকলে পিষ্ট করে।
উন্নত বিশ্বে যখন শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হচ্ছে তখন আমরা তাকে ঘটা করে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা এতটাই নির্দয় ও অমানবিক যে, এমন কোন কাজ নেই যা আমরা শিশুদের দিয়ে করাচ্ছি না। খোঁয়া(ইট)ভাঁঙ্গা হতে শুরু করে পতিতাবৃত্তি পর্যন্ত। খোঁয়া ভাঁঙ্গতে ভাঁঙ্গতে এ সব কোমলমতি শিশুদের হাতের নরম মাংসপিন্ড গুলো যেন শিখ কাবাবের মত হয়ে যায় আর তাদের হাতের তালুগুলো দেখলে মনে হয় তেলে ভাজা পিঁয়াজির অংশ বিশেষ। জীবিকার তাগিদে তবুও চলে একের পর এক ইট ভাঁঙ্গার কাজ। এ সব কথা ভাবলে শিহরে উঠে শরীর,মোচড় দিয়ে ওঠে হৃদপিন্ড, হৃদয়ে ভীষন ব্যথা অনুভব হয়। তখন লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। এ লজ্জা কি শুধু আমার একার! এ লজ্জা আমাদের সকলের। ভেবে দেখুন পাঠক,এই সব আদম সন্তানরা আমাদের ভাই বন্ধু এবং আমাদের সন্তান। এই সকল শিশুরাও চায় সুন্দর এই পৃথিবীতে সূস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে,চায় আনন্দময় জীবন। বের হয়ে আসতে চায় দারিদ্রের  কষাঘাত,পাচারকারি,ধর্ষনকারি তথা মানুষরুপি পশুদের শৃঙ্খল হতে। এই দু-পা বিশিষ্ট প্রানিদের দায়িত্ব কে নেবে? এই নিষ্পাপ ফুলের মত আদম সন্তানদের নির্বিঘেœ চলাফেরা,চিকিৎসা,লেখাপড়া,বাসস্থান তথা মৌলিক চাহিদাগুলো পূরনে কে এগিয়ে আসবে? নাকি এদের সকলের দয়ায় অনুকম্পায় বেঁচে থাকতে হবে। এভাবে বেঁচে থাকার নামকে কি জীবন বলে ? কি মূল্য আছে এ জীবনের ? দেয়ালে পিঠ লেগে থাকা শিশুদের হয়তঃ একদিন দেখা যাবে সারাদেশ জুড়ে মিছিলের কলকানি,স্লোগান একটাই “আমরা বাঁচতে চাই,আমাদের বাঁচতে দিন”।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৩ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪    

বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৬

জনবল ও আর্থিক দৈন্যদশায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে

জনবল ও আর্থিক দৈন্যদশায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
বহুদিন ধরে বহু ক্রশ দূরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা .........দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ......একটি শিশির বিন্দু । বিখ্যাত এই কবিতাটির মমার্থ আমরা সবাই জানি ও বুঝি কিন্তু মানতে চাই না। পাক-ভারত উপমহাদেশের একমাত্র রেলওয়ে কারখানাটি স্থাপিত হয়েছে নীলফামারির সৈয়দপুর উপজেলায়। জনবল,আর্থিক দৈন্যদশা ও লোহা চুরির কারনে রেলওয়ে কারখানাটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। যেন দেখার কেউ নেই। অথচ প্রতি বছর সামান্য ভর্তুকিতেই যে পরিমান কোচ ও ওয়াগন তারা সরবরাহ করছে, যদি বাজেট বাড়ানো হয় তাহলে বিদেশ হতে অনেক টাকা খরচ করে  কোচ ও ওয়াগন আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন ;কারখানাটির হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে এক্ষুনিই সরকারের সদয় দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এ দিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ে কারখানার এক কর্মচারি জানান; এখানে লোহা চুরির একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লোহা রেলওয়ে কারখানা হতে চুরি হয়ে যায়। এই সিন্ডিকেটে সিবিএ নেতা হতে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জড়িত।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সম্পর্কে জানা যায় ; ১৮৬২ সালে ৫৩.১১কি.মি ব্রডগেজ লাইন দর্শনা হতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত নির্মান করা হয়। ১৮৭০ সালে ছোট মিটারগেজ রেললাইন নির্মান করা হয়। ১৯০৩ সালে ওয়াগন ও বাষ্পচালিত ইঞ্জিন মেরামতের জন্য কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৬ সালে ব্রডগেজ রেললাইনের গাড়ি মেরামতের জন্য সূযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৫৩ সালে ভারি যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে পূন:কার্যক্রম চালু করা হয়। ১৯৬৬ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা বগি ও ওয়াগন নির্মান শপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৮৫ সালে রেলওয়ের বাষ্পচালিত ইঞ্জিন হতে ডিজেল ইঞ্জিনে রুপান্তরিত হয়। ১৯৯৩ সালে কারখানার সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে আধুনিকায়নের মাধ্যমে কারখানার সকল কার্যক্রম চালু করা হয়।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সূত্রে জানা যায় ;১১০একর জমির উপর কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত । নির্মান সামগ্রি রয়েছে ২০একর জমির উপর। চারদিকে দেয়াল ৩০.২৫মিটার। কারখানার ভিতরে মিটারগেজ রেললাইন রয়েছে ২৮.৩১কিমি। ব্রডগেজ রেললাইন ১১.২৫কিমি। ডুয়েলগেজ রেললাইন রয়েছে ২৭.০৮কিমি।  
জনবল- মেকানিক্যাল ২৮৪৭ জনের বিপরীতে রয়েছে ১১৪৪জন। ইলেকট্রিক্যাল ৩৩৭জনের বিপরীতে ১৭৫জন। মেডিকেল ১৫৩জনের বিপরীতে ৮৬জন। ওয়ার্কস ৭৫জনের বিপরীতে রয়েছে ৪৬জন। ষ্টোরস্ ৩০৬জনের বিপরীতে ৯৪জন। আরএনবি ১১৩জনের স্থলে ১০১জন। রেলওয়ে ¯ু‹লে ২৫জনের স্থলে ১৮জন। মোট ৩৮৫৬জনের বিপরীতে রয়েছে ১৬৬৪জন। যন্ত্রপতির বয়স-ভারি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ৫০বছরের উপরে বয়স ৩৮৩টির। ২০ হতে ৫০ বছরের মধ্যে বয়স ২০৫টির। ২০বছরের নিচে বয়স ১৫৪টির। মোট ৭৪২টি ভারি যন্ত্র রয়েছে। রেলের খুচরা যন্ত্রাংশের মধ্যে ওয়াগনের যন্ত্রাংশ ২৩৬প্রকারের, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ১২৬প্রকারের। যন্ত্রপাতি ও বিবিধ ২৪৯প্রকারের। মোট ৬১১প্রকার খুচরা যন্ত্রাংশ এই কারখানায় তৈরি হয়। এই কারখানায় মিটারগেজ কোচ ২৩৫টি ব্রডগেজ কোচ ৩২৪টি, মিটারগেজ ওয়াগন ৮১৮২টি, ব্রডগেজ ওয়াগন ২০৫৪টি নির্মান করা সম্ভব। 
কোচ ও ওয়াগন সরবরাহ-২০০৯-১০অর্থবছরে এই কারখানাতে মোট ব্রডগেজ কোচ ১৮১টি এবং মিটারগেজ কোচ ৩৯৫টি তৈরি হয়েছে।
২০১০-১১ অর্থবছরে ব্রডগেজ কোচ ২০৬টি, মিটারগেজ কোচ ৪৮৬টি। ২০১১-১২ তে ব্রডগেজ কোচ ৩০২টি, মিটারগেজ কোচ ৬৩০টি। ২০১২-১৩তে ব্রডগেজ কোচ ৩০২টি, মিটারগেজ ৬১১টি। ২০১৩-১৪তে ব্রডগেজ কোচ ২৬৮টি, মিটারগেজ ৫৪২টি। ২০১৪-১৫তে ব্রডগেজ কোচ ৩১০টি, মিটারগেজ ৬৬০টি তৈরি হয়েছে। ২০০৯ হতে ২০১৫ পর্যন্ত ওয়াগন - ব্রডগেজ ২১৯৭, মিটারগেজ ২৮১৩টি। এছাড়াও ২০১৫সালের গত ঈদুল ফিতরে ব্রডগেজ কোচ ৫৯টি, মিটারগেজ কোচ ২৫টি। মোট ৮৪টি কোচ সরবরাহ করে । গত ঈদুল আজহায় ব্রডগেজ কোচ ৪৫টি এবং মিটারগেজ কোচ ২০টি মোট ৬৫টি কোচ এই কারখানা হতে সরবরাহ করা হয়েছিল।  
বাজেট প্রাপ্তি ঃ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চাহিদা ১৮কোটি ৫০লক্ষ টাকা। পাওয়া যায় ১৫কোটি ১৯লক্ষ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চাহিদা ১৮কোটি ৭৫লক্ষ টাকা, পাওয়া যায় ১৪কোটি ৬৩লক্ষ টাকা। ২০১০-১১অর্থবছরে ১৮কোটি টাকা পাওয়া গেছে ১৬কোটি ৭৯লক্ষ টাকা। ২০১১-১২তে ১৯কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৭কোটি ৭৪লক্ষ টাকা। ২০১২-১৩তে চাহিদা ২৫কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৯কোটি ৫৮লক্ষ টাকা। ২০১৩-১৪তে চাহিদা ২৮ কোটি টাকা পাওয়া যায় ১৮কোটি ২৫লক্ষ টাকা। ২০১৪-১৫তে চাহিদা ৩২কোটি ৮৬লক্ষ টাকা পাওয়া যায় ২২কোটি ৪২লক্ষ টাকা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার নির্বাহি প্রকৌশলী মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা জানান ; জনবল সংকট ও বাজেট ঘাটতির কারনে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা কাঙ্খিত উৎপাদনে যেতে পারছে না । অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান; এখন কারখানাতে লোহা চুরি নেই।
সৈযদপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) নূর আহম্মদ জানান; অনেক চেষ্টা করেও চাহিদা অনুযায়ি বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া জনবল সংকটের কারনে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি অনুরোধ করে এই প্রতিবেদককে বলেন ; ভাই একটু লেখালেখি করেন যাতে আমাদের দেশে কোচ ও ওয়াগন বেশি বেশি তৈরি হলে বিদেশ হতে অনেক টাকা খরচ করে কোচ ও ওয়াগন আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৩ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


  



কালের পথ পরিক্রমায় প্রকৃতি হতে বিলীন হতে চলেছে চিরচেনা শিমূল গাছ

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

কালের পথ পরিক্রমায় প্রকৃতি হতে বিলীন হতে চলেছে চিরচেনা শিমূল গাছ। শিমুলের উদ্ভিদ তাত্ত্বিক নাম  সালমালিয়া মালাবারিকা (Salmalia malabarica) গোত্র বোমবাকাসি (Bombacaceae)। এক সময় চিরচেনা এই গাছটি রংপুরের বদরগঞ্জ সহ দেশের সর্বত্রই দেখা মিলতো। এখন আর সচরাচর চোখেই পড়েনা। শিমুলের ডগডগে লাল ফুল জানান দেয় ফাল্গুনের অগ্নিঝরা দিনের বার্র্তা। গত একযুগ আগেও বাড়ির আনাচে কানাচে শিমুল গাছ চোখে পড়তো। বর্তমানে এ যেন সূদুর অতীত। সরেজমিনে গোটা উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে;ব্যক্তিগত কিংবা নার্সারি গুলোতেও বন্ধ হয়ে গেছে শিমুলের চারা উৎপাদন, তার পরও প্রাকৃতিক ভাবে আপনা আপনি জন্মানো শিমুল গাছকে এক শ্রেণির মানুষ কেটে সাবাড় করে ফেলছে।
কথা হয় উপজেলার রামনাথপুর ইউপির ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের প্রবীন ব্যক্তি ও রামনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন প্রামানিক(৯০)এর সাথে,তিনি জানান; ছোট বেলা হতে আমাদের বাড়ির আশে পাশে বড় বড় অসংখ্য শিমুলের গাছ দেখেছি। একে গাছগুলোকে সবাই কেটে ফেলল। সত্যি কথা বলতে কি অনেক বছর হল শিমুল গাছ আর আমার চোখেই পড়েনি। তিনি আরও জানান;দেশিয় প্রজাতির এ সমস্ত গাছগুলোকে রক্ষা করা জরুরি।
শিমুল গাছ সর্র্ম্পকে কথা হয় বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি  কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি  অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম এর সাথে, তিনি জানান; শিমুলের তুলা দিয়ে আরাম দায়ক লেপ তোষক তৈরি  করা যায়। এখন ইটের ভাটাতে অবাদে শিমুল কাঠ ব্যবহার হচ্ছে। শিমুল কাঠ ইটের ফার্মা তৈরিতেও ব্যবহার হ্েচ্ছ। নির্মানাধীন কোন ভবনের ঢালাইয়ের সহযোগি  হিসাবে শিমুল কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। দিয়াশলাইয়ের কাঠি তৈরিতেও এর ব্যবহার আছে। এখন মূল বিষয় হল চারা উৎপাদন না করে যদি আমরা শিমুল গাছ কেটে ফেলি পরিব্শে একদিকে যেমন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে  অপর দিকে অতীব উপকারি  শিমুল গাছ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। তিনি আরও জানান; অতি দ্রুত সরকারি  কিংবা বে-সরকারি উদ্যোগে শিমুলের চারা উৎপাদন, গাছ রোপন এবং সংরক্ষন জরুরি হয়ে পড়েছে, আর না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম শিমুল গাছ নামে যে কোন গাছ ছিল তা জানতেই পারবে না।
বদরগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় জানান;শিমুলের চারা উৎপাদন,গাছ রোপন এবং সংরক্ষন জরুরি হয়ে পড়েছে।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২২ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪     

বুধবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৬

পাট শিল্পের মত কি হারিয়ে যাবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প!!

শ্রমিক অসন্তোষে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি
পাট শিল্পের মত কি হারিয়ে যাবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প!!

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
জীবন মানে গতিশীলতা। জীবন চলে তার নিজস্ব গতিতে আপন ভঙ্গিমায়। জীবনটাকে উপভোগ করছি আমরা সবাই ভিন্ন রঙ্গে ভিন্ন সাজে;এই যা। বেকার দারিদ্রতা হতাশাগ্রস্থ জীবন বিভিষিকাময় দিনগুলিকে পিছনে ফেলে মূলতঃ নিয়তির উপর ভর করেই আদম সন্তানদের রাজধানি শহরে ছুটে আসা। ছুঁটতে ছুঁটতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে হয়ত দেখা যায় শরীরের কোন স্থান হতে লবণ মিশ্রিত লাল পানি মুছে অথবা ঝটপট কোন নোংরা কাপড় দিয়ে আবৃত করে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে আবারো ছুটা। এ যেন দৌড় দৌড় খেলা। এমন চরম বাস্তবতাকে স্বচক্ষে দেখতে গেলে সকাল ৭টা হতে ৮টার মধ্যে রাজধানি শহরের যেকোন রাস্তায় কিংবা গলির দিকে তাকালেই এর সচিত্র সহজেই চোখে পড়বে। রাজধানিতে ছুটে আসা এই সমস্ত দরিদ্র মানুষের ঢল যে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে আসা তাদের আঞ্চলিক কথাবার্তায় সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে মঙ্গাপিড়িত অঞ্চল বলে খ্যাত উত্তরাঞ্চলের মানুষের সংখ্যাই বেশি।
মূল প্রসঙ্গে আসার আগে ছোট বেলার একটি ঘটনা মনের মাঝে উকি দিচ্ছে। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। বৃত্তি ও সমাপনি পরীক্ষার পূর্বে আমার শ্রদ্ধেয় স্যার বাবু হরেন্দ্রনাথ রায় উনি আমাকে পাট রচনা লিখতে না পারার অপরাধে আমার গালে একটা থাপ্পড় বসালেন। পরবর্তীতে যাতে আমাকে আর থাপ্পড় খেতে না হয় এই ভয়ে আমি পাট রচনা মুখস্ত করে স্যারকে লিখে দেই। স্যার তখন আমাকে পরম মমতায় কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললেন আমাদের দেশের মূল চালিকাশক্তি এই সোনালি আঁশ পাট। এই পাট সম্পর্কে না জানলে কি হয়? সেই সময় বুঝিনি মূল চালিকাশক্তি মানে কি? আর আমার মূল চালিকাশক্তির মানে জেনেই বা কি? এখন যখন বুঝলাম তখন সেই সোনালি আঁশ পাট বর্তমানে আমাদের সোনালি অতীত।
আমরা সবাই জানি বাংলাদেশের পাট শিল্পের করুণ পরিণতির জন্য দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র,এই শিল্পের সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তাদের সীমাহীন উদাসিনতাও কম দায়ি ছিল না। এছাড়াও পাট শিল্পের উন্নয়ন,পন্যবৈচিত্র উদ্ভাবন, উৎপাদিত পন্যের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস প্রভূতি বিষয় নিয়ে এই শিল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তা ব্যক্তিগন খুবই উদাসীন ছিলেন। অনেক কিছুর জন্য তারা সরকারের ভূর্তকির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মোট কথা ভূর্তকি এই শিল্পের উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল আমাদের সোনালি আঁশ পাট তথা পাট শিল্প। সাময়িকভাবে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়লেও পাট শিল্পের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের। সেই ১৯৮১ সালে ছোট্ট পরিসরে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে বর্তমানে শতশত গার্মেন্টস শিল্পে রুপ নেয়। বাংলাদেশের এখন মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই শিল্প। কারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ৭০শতাংশ আসে এই খাত হতে। শুরু হতেই যেন এই শিল্পের শনির দশা কাটছে না। হরতাল অবরোধ অসহযোগ রাজনৈতিক অস্থিরতা শ্রমিক অসন্তোষ শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা প্রতি মূহুর্তে ভূ-কম্পনের মত এই শিল্পটির ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। তা না হলে বার বার এই শিল্পের এতো বিপর্যয় কেন? কেনইবা দোষিরা বারবার পার পেয়ে যায়? ফলশ্রুতিতে একের পর এক দূর্ঘটনা ও শ্রমিক অসন্তোষ। সংক্ষেপে এই শিল্পে দূর্ঘটনার বিবরণ সবার জ্ঞাতার্থে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
এক. ১৯৯০ সালে ঢাকা মিরপুরের সারিকা গার্মেন্টস এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৭জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে আহত হয় অনেক শ্রমিক।
দুই. ২০০৫ সালে ৭ জানুয়ারি নারায়নগঞ্জে খান নিমির পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই সালের ১১ এপ্রিল বুধবারে সাভারের বাইপাইলে শাহ্রিয়ার ফেব্রিক্স ও স্পেকট্রাম সোয়েটার কারখানার ৮ম তলা বিশিষ্ট ভবনটি ধ্বসে ৬৫জন শ্রমিক মারা যায়। আহত হয় অনেকে।
তিন. ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের এরিনা কেটিএস টেক্সটাইলে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৬৫ জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করে। একই সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ একদিন পরেই তেজগাঁও ফিনিক্স ভবন ধ্বসে ২১ জনের প্রাণহানি ঘটে।
চার. ২০১০ সালে গরিব এন্ড গরিব পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ডে ২২ জন শ্রমিক নিহত হয়। একই সালের ১ জুন রাত ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার বেগুনবাড়ি অঞ্চলের ৪ তলা ভবন পাশের ৩ তলার উপর ধ্বসেপড়ে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হামিম গ্রুপের গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৩০ জন শ্রমিক মারা যায় ২০০ শতাধিক শ্রমিক আহত হয়।
পাঁচ. ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশান নামের পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৫ জন।
ছয়. ২০১৩ সালের সাভারের রানাপ্লাজা ধ্বসে ১১২৭জনের মৃত্যুর ঘটনা ছিল একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা এটা আমরা সবাই জানি।
আমার জানতে ইচ্ছা করে আর কত শ্রমিক এভাবে আত্মহুতি দিবে!! যাদের সস্তা শ্রম, ঘাম আর আত্মদানে যখন দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি হচ্ছে ঠিক তখনই আমাদের শিল্প মালিকরা (কতিপয়) নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রি দিয়ে তাদের মতো করে তৈরি করা ভবনে শ্রমিকদের চরম উৎকন্ঠা আর নিরাপত্তাহীনতার মাঝে ঠেলে দেয়। একবারও কি ভেবে দেখছি এদের নিশ্চিত মৃত্যুর মাঝে ঠেলে দেয়া মানে দেশের অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া।
এ সকল ঘটনার পরপরই ওই সময় বাংলাদেশের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট, জেসিপেনি, এইচ এন্ড এম, বেষ্ট সেলার, টেসকো, লেভিস, জি ষ্টার, লি এন্ড ফং, জিআইজেড সহ বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়ে দিয়েছিলেন হরতাল অবরোধসহ শ্রমিকদের নিশ্চিত নিরাপত্তা দিতে না পারলে তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন (সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন)।
দেশে বিদেশে আলোচনা ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেরিতে হলেও শ্রমিকদের স্বার্থ নিরাপত্তা ও অধিকার সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। তবে শুধু আইন করলেই চলবে না বাস্তবিক অর্থে যথার্থ প্রয়োগও দরকার। মজার ব্যাপার হলো দেশের ৩৪ রপ্তানি পন্যের তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান প্রায় ৮০ শতাংশ। বাকি ৩৩ খাত থেকে রপ্তানি আয় আসে ২০ শতাংশের মতো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইউপিবি)র হিসেবে সর্বশেষ দেখা গেছে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রায় গার্মেন্টসের পরে যেসব খাতের উল্লেখ রয়েছে সে গুলোর অবদান অতি নগন্য।
যেখানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান হরতাল অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি হতে বিরত থাকতে বলেছে, তা না হলে তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন সেখানে ওই সময়ে নতুন করে হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়াটা এই শিল্পের জন্যে কতটা যৌক্তিক ছিল। একদিনের হরতাল অবরোধে এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকা (সূত্রঃ সকালের খবর ৯ জানুয়ারি/১৫) এবং উৎপাদন কমে যায় ৩০-৩৫ শতাংশ। তাহলে সময়ে ওই কয়েকদিনের হরতাল অবরোধে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
সবকিছু কাটিয়ে উঠে যখন বর্তমান সরকার যখন দেশকে স্থিতিশীল ও মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত করছে এই সময়ে আবার নতুন করে গার্মেন্টস্ শ্রমিক অসন্তোষ এবং টানা ৯ দিন ধরে আশুলিয়ার ৫৫ গার্মেন্টস্ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা। দেশের একজন সামান্য নাগরিক হিসেবে এই শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে উৎকন্ঠা বোধ করছি। 
পরিশেষে বলতে চাই,যে শিল্পটি দেশের অর্থনীতির ভিত পোক্ত করছে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির দিকে সেই শিল্পটিকে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। একে বাঁচাতে হলে বাংলাদেশে কখনও কোনদিন কোন রাজনৈতিক দল হরতাল অবরোধ রাজনৈতিক সহিংসতার মত গনবিরোধি কাজ বন্ধ রাখবেন নতুবা গার্মেন্টস শিল্পকে এর আওতামুক্ত রাখা যায় কি না দয়া করে ভেবে দেখবেন এবং সেই সাথে শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারন উৎঘাটন করে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। দেশের স্বার্থে এই শিল্পটিকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২১ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

হারিয়ে যাচ্ছে দেশিয় বাদ্যযন্ত্র ঢাক-ঢোল

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি
হারিয়ে যাচ্ছে দেশিয় বাদ্যযন্ত্র ঢাক-ঢোল


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
রতন দাস(৫৫) ও সুরেশ দাস(৪৫)। দুই ভাই। আদি জন্ম নিবাস টাঈাইল জেলায়। জন্মের পর হতে বাবা রাজেন্দ্র দাস ও দাদুকে দেখেছেন দেশিয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে। তাদের কাজে সহয়োগিতা করতেন মা  আমাপতি দাস(৯০)। ওই সময় দেশিয় বাদ্য যন্ত্রের চাহিদা এত বেশি ছিল যে দম নেয়ার সময় ছিল না তাদের। সময়ের সাথে সাথে আধুনিক বাদ্য যন্ত্রের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়। স্বাধীনতার পর বাধ্য হয়ে বাবা রাজেন্দ্র দাস টাঈাইল জেলা হতে রংপুরের বদরগঞ্জে চলে আসেন। শুরু করেন দেশিয় বাদ্য যন্ত্র ঢাক,ঢোল,করকা,তবলা,খোল,একতারা,খমর,খঞ্জুনি,দো-তারা,লাল,ঢোলক,ডমরু সহ সাইড ড্রাম তৈরি ও মেরামতের কাজ। পিতা রাজেন্দ্র দাস মারা যাওয়ার পর দুই ভাই রতন দাস ও সুরেশ দাস একসঙ্গে বাবার ব্যবসা পরিচালনা করলেও ব্যবসা দিয়ে দুই পরিবারের ভরন-পোষন কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছিল বাধ্য হয়ে সুরেশ দাস গাইবান্ধা জেলার লক্ষ্মিপুরে বসতি গেড়ে দেশিয় বাদ্য যন্ত্রের ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
সরেজমিনে গতকাল বুধবার (২১ডিসেম্বর) সকালে পৌরশহরের ফায়ারসার্ভিস মহল্লায় রতন দাসের দেশিয় বাদ্য যন্ত্রের দোকানে গিয়ে কথা হয় তার সাথে,তিনি জানান;আগের মত আর দেশিয় বাদ্য যন্ত্রের চাহিদা নেই। কষ্ট করে বাপ-দাদার জাত পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। রতন দাস আরও জানান;কার্তিক মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের যে সমস্ত লোক গ্রামে গ্রামে কীর্তন করে বেড়ায় এরাই মূলতঃ দেশিয় বাদ্য যন্ত্রের ক্রেতা। এছাড়াও বাসাবাড়ি,বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের লোকেরা কিছু কিছু করে ক্রয় করেন। তিনি জানান; এসব দেশিয় বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় ২শত টাকা হতে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। সাধারন ঢুলিদের কাছে তিনি কম দামে বাদ্য যন্ত্র বিক্রি করেন।
রতন দাসের মা আমাপতি দাস (৯০)জানান; ছেলেদের বলেছি, যত কষ্টই হোক বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখতে।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিমলেন্দু সরকার জানান; দেশিয় বাদ্যযন্ত্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর আধুনিকায়ন যেমন জরুরি,তেমন জরুরি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাও। তা না হলে বাংলার ঐতিহ্য ঢাক-ঢোল,তবলা একতারা,দো-তারা একদিন হারিয়ে যাবে।
বদরগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার নজরুল ইসলাম জানান;দেশিয় বাদ্য যন্ত্র ঢাক ঢোল আজ হারিয়ে যেতে বসেছে,যদি কেউ দেশিয় ঐতিহ্য ঢাক-ঢোলকে টিকিয়ে রাখতে চায় তাকে সহযোগিতা করা উচিত।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২১ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪



অস্তিত্ব সঙ্কটে বদরগঞ্জের হরিজন সম্প্রদায়

অস্তিত্ব সঙ্কটে বদরগঞ্জের হরিজন সম্প্রদায়


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

হরিজন একটি দলিত সম্প্রদায়ের নাম। এক সময় এই সম্প্রদায়ের মানুষদের কদর এতটাই ছিল যে এদের ছাড়া বিশেষ কিছু কাজ কল্পনাই করা যেত না। সময় বদলে গেছে সময়ের সাথে সাথে তাদের প্রয়োজনও সীমিত হয়ে গেছে। কাজ নেই মাথা গোজার ঠাঁই নেই এই ভাবনায় জীবনের তাগিদে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষরা এক স্থান হতে অন্য স্থানে বিশেষ করে রাজধানি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে গেছে। যারা আছেন তারাও অনেক কষ্টে কোন রকমে যাযাবরের মত ব্ঁেচে আছেন। এখন তাদের ঠিকানা রেল বস্তি সংলগ্ন ঝুপড়ি ঘর। এ হল রংপুর বদরগঞ্জের হরিজন সম্প্রদায়ের গল্প।
সরেজমিনে হরিজন পল্লীতে গিয়ে জানা যায়;বদরগঞ্জে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বহু যুগ ধরে। নিজস্ব জায়গা বলতে তাদের কিছুই ছিল না। বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছিলেন খাস জমিতে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খাস জমি হতে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এমতবস্থায় তারা বসতি গড়ে তোলেন রেল লাইনের ধারে। বর্তমানে বদরগঞ্জে হরিজন সম্প্রদায়ের ২৫টি পরিবারের প্রায় দেড়শ’ মানুষ রেল লাইনের জীর্ন বস্তিতে বাস করছেন। এদের আয়ের প্রধান উৎস হল নোংরা ও আবর্জনা পরিস্কার করা। এ হতে যা উপার্জন হয় তা দিয়ে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। নোংরা জীর্ন স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে গড়ে ওঠা হরিজন বস্তিতে গিয়ে কথা হয় কালিপদ(৩৮) সাথে, তিনি জানান; পৌরসভায় তিনি কাজ করেন অস্থায়ি ভিত্তিতে। মাস শেষে যে পারিশ্রমিক পান তা দিয়ে আর যাই হোক সংসার চলে না। সংসার চলে না বলে একমাত্র মেয়েকে তিনি শ্বশুর বাড়িতে রেখেছেন। হরিজন সাধনা রানি (৩৬) বলেন;ভোট আসলে আর সবার মত আমাদের কদর বাড়ে,তথন নেতারা কত কথা কয়, ভোট গেলে আমাদের খবর আর কেউ রাখে না। হরিজনদের অনেকেই এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন;তারা যে কাজ করেন তা অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও তা করতে শুরু করেছেন। ফলে তাদের আয়ের উৎস সীমিত হয়ে আসছে।
হরিজন গীতা রানি(৩২) জানান; এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা বাঁচব কি করে ? হরিজন সম্প্রদায়ের আমরা সবকিছু থেকে বঞ্চিত।  হাতে যেমন কাজ নেই তেমনি আমাদের স্থায়ি  ঠিকানাও নেই।
বদরগঞ্জ পৌর মেয়র উত্তম সাহা বলেন; হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজনের কথা চিন্তা করে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লোককে কাজে নিয়োগ করা হয়েছে।


বদরগঞ্জ রংপুর
তারিখ-২০ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল- ০১৭১৭৮৫০৯৬৪

 

সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

বাঁধের ফাঁদে “বাংলাদেশ” পরিত্রান কি একবারেই অসম্ভব!

বাঁধের ফাঁদে “বাংলাদেশ” 
পরিত্রান কি একবারেই অসম্ভব!


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ আছে ” পিঠে পড়রে কিল, পাগলেও ছুড়ে ঢিল” অর্থ্যাৎ নিজের ব্যাপার পাগলেও বুঝে।
চীন নিকট অতীতে ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস্থলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বাঁধ নির্মানের ঘোষনা দিয়েছিল। চীনের এই ঘোষনার পর পরই ভারত সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল,ওই সময় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিবাদও  হয়েছে। একদা আমাদের এই দেশ ছিল প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি এর উত্তরে রয়েছে হিমালায় পর্বতমালা অভিভাবকের মত। দক্ষিনের পদতলে নিরন্তর প্রবাহিত বঙ্গোপসাগর। আর সমগ্র সমতল ভুমি জুড়ে রয়েছে জালের মত অসংখ্য নদ-নদী। এই নদ-নদী বাংলাদেশকে করে তুলেছে সৌন্দর্যের লীলানিকেতন। আর এর প্রবাহমান জলধারা বাংলাদেশকে শষ্য শ্যামল সুদৃশ্য দেশ হিসাবে গড়ে তুলে গৌরবময় স্থান দিয়েছিল বিশ্বসভায়। এ দেশের নদ-নদী যুগপৎ আমাদের সমৃদ্ধি ও  সৌন্দর্যের  প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হত।নদীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের যে অপরুপ রুপ মাধুরি তা মানুষের মনকে ছুঁয়ে যেত গভীর ভাবে। শুধুমাত্র নদীই এ দেশের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুনে।বর্তমানে নদীর এই অপার সৌন্দর্যমন্ডিত চিরচেনা রূপ আর চোখে পড়ে না ভাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের অবিবেচকের মত আন্তর্জাতিক নদী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অসংখ্য বাঁধ নির্মানের কারনে।
চীন বাঁধ নির্মান করেছে যেখানেঃ
নিকট অতীতে চীন তার দেশের তিব্বত এলাকায় দাগু, জিয়াচা, ও জিইশু পার্বত্য এলাকায় ব্রাহ্মপুত্রের উপর তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে। এ প্রকল্প গুলোতে পর্যাপ্ত পানি যোগানোর জন্য ব্রহ্মপুত্রের উপর তিনটি বাধ নির্মান করছে চীন। চীন শাসিত তিব্বতে আমাদের ব্রহ্মপুত্রের নাম সেদেশে সেংপো। এটি এশিয়ার দীর্ঘতম নদী। এর দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯০৬ কিলোমিটার। এ নদী তিব্বত (১৬২৫ কিঃমিঃ) ভারত (৯১৮ কিঃমিঃ) ও বাংলাদেশ (৩৬৩ কিঃমিঃ) উপর দিয়ে প্রবাহিত। জনগনের পানির চাহিদা মেটাতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চীন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভারত তো বটে বাংলাদেশ আবারো নতুন করে অকল্পনীয় ক্ষতির স্বীকার হবে। আন্তর্জাতিক নদী আইনে কি আছে?যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত হেলসিংকি (১৯৬৬) নীতিমালার ৪ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রতিটি অবহবাহিকাভূক্ত দেশ অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। এ জন্য অবশ্যই যেন অন্য দেশের কোন ক্ষতি না হয় সে দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। একই আইনের ২৯(২) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “একটি রাষ্ট্র নদী অববাহিকার যেখানেই অবস্থান করুক না কেন তার যে কোন প্রস্তাবিত অবকাঠামো নির্মান এবং ইনস্টলেশনের ব্যাপারে নদী অববাহিকায় অবস্থিত অন্য যে কোন রাষ্ট্র এই কাজের ফলে অববাহিকায়  ঘটা পরিবর্তনের কারনে যার স্বার্থহানি হওযায় আশঙ্খা রযেছে তাকে এ ব্যাপারে নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ গ্রহীতা দেশ যেন প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফলের বিচার-বিশ্লেষন করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি থাকতে হবে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের উজানে বাঁধ নির্মানের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরন তো করেইনি বরং তারা সব সময় গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশ  নামক  ভুখন্ডে ভারতের বাধ নির্মান নতুন কোন ঘটনা নয়। সেই ১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে ৮০ হাজার কোটি রুপি খরচ করে এ পর্যন্ত ৩৬০০ বাঁধ নির্মান করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৪টি আন্তনদীর মধ্যে ৪৭টি নদীতেই বাঁধ দিয়েছে ভারত।World Commission of Dam(WCD); ১২৫ টি বাঁধের উপর সমীক্ষা চালিয়ে তাদের গবেষনায় এটাই প্রতীয়মান হয়েছিল যে; বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য বেশিরভাগ বাঁধ নির্মান করা হলেও বন্যা খরার প্রকোপ বেড়েছে, বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মানের ফলে উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় সাড়ে আট কোটি মানুষ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্বাস্তুর সংখ্যার চেয়ে বেশি। সর্বসাকুল্যে তারা এই বাঁধ নির্মান প্রকল্পকে মানূষ পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং উৎপাদনের জন্য অলাভজনক বলেছিল।
উৎপত্তিস্থল হতে ভারত এক তরফা নদীশাসন তথা স্বাদু পানিকে নিজ নিয়ন্ত্রনে নেয়ার আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জীবন ধারনের জন্য পানির গুরত্ব অপরিসীম বটে তবে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিঃসন্দেহে স্বাদু পানি। একটি পরিসংখ্যানের আলোকে বিশ্বে স্বাদু পানির পরিমান দেখা যেতে পারে।

পানির উৎস    বর্হিভাগ হিসাবে
বর্গমাইলে     আয়তন হিসাবে
ঘনমাইলে    শতকরা পরিমান
ক)লবনাক্ত পানি
সমুদ্রের পানি
আভ্যন্তরীন সাগর ও হ্রদের পানি   
১৩৯,৫০০,০০০
২৭০,০০০   
৩১৭,০০০,০০০
২৫,০০০   
৯৭.২
০.০০৮
মোট    ১৩৯,৭৭০,০০০    ৩১৭,০২৫,০০০    ৯৭.২০৮
খ)স্বাদু পানি
হ্রদের পানি
নদীর পানি
উত্তর মেরুর বরফ
দক্ষিণ মেরুর বরফ
বাতাসে জলীয় বাষ্প
ভূ-গর্ভস্থ পানি   
৩০০,০০০
    
৬১,০০০,০০০
৯০০,০০০
১৯৮,০০০,০০০
   

৩০,০০০
৩০০
৬,৫০০,০০০
৫০০,০০০
৩১০০
২,০১৬,০০০   
০.০০৯
০.০০১
১.৯৯২
০.১৫৪
০.০০১
০.৬৩৫
মোট    ২৬০,২৩০,০০০    ৯,০৪৯,৪০০    ২.৭৯২
সর্বমোট    ৪০০,০০০,০০০    ৩২৬,০৭৪,৪০০    ১০০.০০০

উপরের পরিসংখ্যান হতে দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবীর মোট পানির আয়তন ৩২৬,০৭৪,৪০০ ঘনমাইল। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯৭ ভাগ লবনাক্ত পানি (স্যালাইন ওয়াটার) এবং ২.৫০ভাগ (নরমাল ওয়াটার) স্বাদু পানি। মোট স্বাদু পানির অধিকাংশই বরফ হিমবাহ ও জলীয় বাস্পে আবদ্ধ। হ্রদ, নদী ও খাল-বিলে অবস্থিত পানির পরিমান খুবই সামান্য। অর্থাৎ পৃথিবীর মোট পানির পরিমান ০.০১ ভাগ। (সুত্রঃ স্নাতক উদ্ভিদ বিজ্ঞান; প্রফেসর আমজাদ আলী খান)।ভারতের দেয়া অনেকগুলো বাঁধের মধ্যে আমাদের দেশে আলোচিত দুটো বাঁধের মধ্যে একটি হলো ফারাক্কা বাধ। এই ফারাক্কা বাঁধের কারনে আমাদের উত্তরাঞ্চল আজ মরুকরনের পথে। এটা দেশবাসি প্রত্যেকেই জানে। শুধু তাই নয় ভারতের উজানে বাঁধ দেয়ার কারনে বাংলাদেশের বড় বড় সেচ প্রকল্প যেমন তিস্তা সেচ প্রকল্প, গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) প্রকল্প, ডি.এন.ডি প্রকল্প, কর্নফুিল বহুমুখি সেচ পরিকল্পনা, ব্রহ্মপুত্র সেচ প্রকল্প, গোমতি পরিকল্পনা, মেঘনা উপত্যকা পরিকল্পনা সহ অসংখ্য পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ( অবশ্য এ হিসাব অবকাঠামো ও ভূমির অপচয় যোগ করেই) । 
দ্বিতীয়টি হলো “টিপাইমুখ বাঁধ”। এর একটু ইতিহাস আমাদের সংক্ষেপে জানা দরকার। আসাম রাজ্যের কাছাড় অঞ্চলের মৌসুমি বন্যা প্রতিরোধের নামে মনিপুরের ২৭৫.৫০বর্গ কিঃমি এলাকায় বাঁধ নির্মানের পরিকল্পনা হাতে নেয় ভারত সরকার। আসামের জনগনের প্রতিরোধের মুখে ভারত সরকার মনিপুরের বরাক নদের উপর বাঁধ নির্মানের স্থান ক্রমেই পরিবর্তিত হতে থাকে। ১৯৫৫ সালে ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়নধর এরপর ভূবন্দর এবং সর্বশেষ ৮০র দশকে টুইভাই ও বরাক নদের সঙ্গম স্থলের ৫০০ মিটার ভাটিতে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মানের পরিকল্পনা করা হয়। প্রথমে বাধটি ব্রহ্মপুত্র ফ্লাড কন্ট্রোল বোর্ড (ই.ঋ.ঈ.ই) আওতায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯৯৯ সালে এটিকে নর্থ ইষ্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (নেপকো) হাতে দেওয়া হয়। তখন থেকে বাঁধটির নাম টিপাইমুখ হাই ড্যাম থেকে পরিবর্তিত  হয়ে টিপাইমুখ পাওয়ার প্রজেক্ট হয়। টিপাইমুখ নামের গ্রামে বরাক এবং টুইভাই নদের মিলন স্থলের ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে বরাক নদে ৫০০ফুট উঁচু এবং ১হাজার ৬০০ফুট দীর্ঘ বাধ নির্মান করে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ভারত সরকার কাজ শুরু করেছে। বরাক নদ ভারতের মনিপুর রাজ্যের কাছাড় পর্বতে উৎপন্ন হয়ে মনিপুর আসাম মিজোরামের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতের অমলসিদ নামক স্থানে নদটি সুরমা ও কুশিয়ারা এ দুভাগে বিভক্ত হয়ে সিলেট জেলার জকিগঞ্চ দিয়ে প্রবেশ করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা হবিগঞ্জের মারকুলির কাছে পুনরায় মিলিত হয়ে কালনি নামে প্রবাহিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে কালনি ঘোড়াউত্রা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম ধারন করে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশিছে। বরাক নদের ভারতে প্রবাহিত অংশের দৈর্ঘ্য ৪৯৯ কিঃমিঃ। আর বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ্য ৪০৩ কিঃমিঃ। সুরমা ও কুশিয়ারা পাচটি প্লাবনভূমি অতিক্রম করেছে যার অববাহিকায় বাংলাদেশের গুরত্বপূর্ণ কৃষি নির্ভর জনবসতি গড়ে উঠেছে।এই ফারাক্কার  কারনে গোটা উত্তরাঞ্চল এবং টিপাইমুখ বাঁধের কারনে গোটা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যে বিপর্যয় দেখা দেবে। তাতে নিঃসন্দেহে সমগ্র বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে। আমাদের মত গরিব দেশ কি এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবে? এর সঙ্গে আবার নতুন করে যুক্ত হচ্ছে বক্ষ্মপুত্র নদের উৎসস্থলে বাধ নির্মান। অব¯া’ দৃষ্টে মনে হচ্ছে বাঁধের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পরিত্রান কি একেবারেই অসম্ভব?আমার কছে মনে হয় আমাদের সবার আগে দরকার মাথা উচু করে দাড়ানোর মানসিকতা। ভারত বড় রাষ্ট্র বলে কি; বাংলাদেশের উজানে বাঁধ দিলে বাংলাদেশের কিছুই করার নেই ॥ অবশ্যই আছে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। প্রায় একই ধরনের সাংস্কৃতিক ঐক্য এখানে বিরাজমান।আমরা এও জানি ভারতের অভ্যন্তরে রয়েছে পাঁচ শতাধিক জাতি- ভাষা- ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। যা দেশটির অখন্ডতা রক্ষার প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারনে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দর কষাকষিরও হাতিয়ার।
সেই সময়ের ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব রাজিব সিক্তি কলকাতায় “বিমসটেক অগ্রগতির পথ” শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশকে ভারতের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন প্রতিবেশি হিসাবে অভিহিত করে বলেছিলেন; বাংলাদেশের সাহায্য ও সমর্থন ছাড়া আমরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেতে পারবো না। আমাদের পূর্বমুখি নীতির সফলতার জন্য বাংলাদেশ সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ। উক্ত সেমিনারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলিয় কমান্ডের সাবেক প্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল জে.আর মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন; বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অর্থপূর্ন উপায়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রশমন করেছে। (সুত্রঃ দৈনিক খবর)।
এখন আমার প্রশ্ন হল যেখানে ভারতের কর্নধাররা বাংলাদেশকে এতটা গুরত্ব দিচ্ছে গুরত্বপূর্ণ ভাবছে সেখানে বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধীদলের নেতা নেত্রি সহ বাংলাদেশের জনগন নিজেকে এতটা গুরত্বহীন ভাবছে কেন?
এমতবস্থায় তিব্বতীয় মালভূমি এলাকায় দক্ষিনমূখি সব নদীর উপর বৃহৎ চীনের উন্নয়ন প্রকল্পের সব তথ্য ভাটির দেশগুলোর কাছে প্রকাশ করা উচিত। হিমালয় এলাকার দক্ষিনমূখি নদীর উপর পরিকল্পিত সমস্ত অবকাঠামো বাতিল করন, চীন ভারত ভূটান নেপাল ও  বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত সব আন্তরাষ্ট্রীয় নদী ও পানি সম্পদ বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রনয়ন; নদীর উপর বৃহৎ অবকাঠামো নির্মানের নীতি পরিহার এবং মুক্ত নদী নীতি গ্রহন করতে হবে। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাও জরুরি। আন্তর্জাতিক নদী আইনের প্রতি সকল দেশের শ্রদ্ধাশীল হওয়াটাও জরুরি। আমাদের সরকারকে এ ব্যাপারে সব সময় তৎপর হতে হবে। নচেৎ বাংলাদেশ সাহারা মরুভূমি হতে আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।


বদরগঞ্জ,রংপুর।
তারিখ-১৯ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

বদরগঞ্জের ধনূকররা এখন লেপ তোষক তৈরিতে ব্যস্ত

বদরগঞ্জের ধনূকররা এখন লেপ তোষক তৈরিতে ব্যস্ত

কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ব্যবসায়িরা তিল তিল করে দেশের সমৃদ্ধি সাধনে সহায়তা করছে। সামান্যতম পৃষ্ঠপোষকতা পেলেই দেশের এসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ব্যবসায়িরা আমাদের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়িদের নানা ধরনের ব্যবসার মধ্যে লেপ-তোষক তৈরি তথা ধনুকরি ব্যবসা। এটি মূলতঃ একটি মৌসুমি ব্যবসা। উত্তরের জনপদ রংপুরের বদরগঞ্জে এরই মধ্যে শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ধনুকরদেরও ব্যস্ততা এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। মৌসুমি এ পেশায় বেশি কাজের মাধ্যমে বেশি মুনাফার আশায় সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে অনেকেই রাত দিন সমান তালে শ্রম দিয়ে চলেছেন লেপ তোষক কম্বল তৈরির কাজে।
সরেজমিনে মৌসুমি এ পেশার সাথে জড়িত মালিক ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে; ষাটের দশকে বদরগঞ্জ উপজেলায় সর্বপ্রথম এ ব্যবসা শুরু করেন মরহুম মোবারক  হোসেন। ধীরে ধীরে এই ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। বর্তমানে বদরগঞ্জ পৌরসভাতেই ৩৫ জন ব্যবসায়ি এই ব্যবসা করছেন।
গরুর হাল দিয়ে গ্রামে গ্রামে জমি চাষ করা গরিব ওমেদ আলি(৬০) এখন এই ব্যবসা করেই প্রতিষ্ঠিত। কথা হয় প্রতিষ্ঠিত ধনুকর ব্যবসায়ি রামনাথপুর ইউপির বানুয়াপাড়া গ্রামের ওমেদ আলির সাথে তিনি জানান; এক সময় গরুর হাল দিয়ে গ্রামে গ্রামে মানুষের জমিতে হাল চাষ করতাম। তারপর জীবিকার তাগিদে ছোট পানের দোকান করি। এক পর্যায়ে এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ি। আল্লাহ্র রহমতে আমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নাই। মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে এই ব্যবসা শুরু করি। অনেক পরিশ্রম করেছি। বর্তমানে তিন বিঘা ধানি জমি, পৌরসভাতে বাসা বাড়ি সহ কিছু নগদ অর্থ জমিয়েছি। তবে সরকার যদি একটু সহযোগিতা করতো তা হলে এই শিল্পটিও একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিনত হতে পারতো। আমার ভাল লাগে আমার এই কারখানায় অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।

বদরগঞ্জ, রংপুর।
তারিখ- ১৯ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


     

শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

খাদ্য নিরাপত্তা দানকারি কৃষকদের বঞ্চনা করে কি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন সম্ভব !

খাদ্য নিরাপত্তা দানকারি কৃষকদের বঞ্চনা করে কি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন সম্ভব !


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামকগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল নাগরিকদের খাদ্যের নিশ্চিত নিরাপত্তা বিধান করা। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং স্বাধীনতা পরবর্তী এই কাজটিই এখন পর্যন্ত নিরলস ভাবে করে যাচ্ছে আমাদের দেশের ৮০ ভাগ কৃষক। অথচ এই কৃষি তথা নিরক্ষর কৃষককে সব সময় অবজ্ঞা অবহেলা আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির স্বপ্ন দেখিয়ে ভোটের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো সাময়িক ফায়দা হাসিল করতে পারলেও এই কৃষি তথা কৃষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন তো হয়নি বরং তারা আরও হয়েছে নিঃস্ব নিঃপেষিত।এই কৃষি প্রধান দেশে কৃষি তথা কৃষককে নিঃস্ব রুগ্ন করে কিভাবে খাদ্য নিরাপত্তা বিধান সম্ভব? আমাদের সংবিধানের ১৫(ক) ধারায় অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উদ্ধৃত করা আছে। আসলে আমাদের রাষ্ট্র কি সঠিকভাবে এ দায়িত্ব পালন করছে? আমাদের জানতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা কি? খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কি কি সমস্যা এবং কিভাবে এই সমস্যাকে মোকাবেলা করা যায় ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা খাদ্যের নিশ্চিত নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করবো? সহজ সরল ভাষায় খাদ্য নিরাপত্তা হল একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য খাবারের নিশ্চয়তা দেয়া। এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখন কোন পর্যায়ে আছে বিশ্ব খাদ্যসংস্থা,বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট, বিভিন্ন ধরণের গবেষনার ফলাফল, গবেষকসহ দেশ বরেন্য অর্থনীতিবিদদের দেয়া তথ্য অনুযায়ি বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করা যাক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ি এ দেশে ৩১.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে। যারা গড়ে দৈনিক প্রয়োজনীয় ২২০০ কিলোক্যালরি সংগ্রহ করার মতো যথেষ্ট খাবার পায় না। যারা মাথা পিছু ন্যূনতম ১৮০৫ কিলো-ক্যালরি আহারের সংস্থান করতে পারে না তাদেরকে বলা হয় হতদরিদ্র। এরা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ। আবার শহরের তুলনায় গ্রামে হতদরিদ্রের সংখ্যা বেশি। গ্রামে এদের সংখ্যা ২৯ শতাংশ আর শহরে ১৫ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে আঞ্চলিক বৈষম্য। হতদরিদ্রের সংখ্যা বরিশাল বিভাগে (৩৬ শতাংশ), এর পর বৃহত্তর রাজশাহি বিভাগে (৩৫ শতাংশ)।
বিশ্ব খাদ্যকর্মসূচির (ডঋচ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ি জানা যায় বাংলাদেশে ন্যুনতম ক্যালরি না পাওয়া মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ১০ লক্ষ।
তথ্যানুযায়ি গত ১০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। আবাদি জমি কমেছে ৭ শতাংশ। ২০২১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ কোটি ২০ লক্ষ। ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রতিবেদনে যে পূর্বাভাস দেখা হয়েছিল তার উপর ভিত্তি করে বলা যায় ২০৫১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ন্যুনতম ২২ কোটি। এর মধ্যে ১৪ কোটি লোক বাস করবে শহরাঞ্চলে। আবাদি জমির পরিমাণ ভয়াবহ রকমের হ্রাস পাবে। প্রশ্ন হল তখন কিভাবে এদেশের মানুষ খেয়ে পরে বাঁচবে?
এরই মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতা নিয়ে রয়েছে শাসক শ্রেণির ধুম্রজাল, একটি বিশ্লেষণধর্মি তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টিকে মূল্যায়ন করা যাক (সূত্র-মহিউদ্দিন আহমদ, গবেষক) এরশাদ সরকারের আমলে বাংলাদেশ গড়ে প্রতি বছর ১৯ লাখ টন খাদ্য আমদানি করেছিল। খালেদা সরকারের প্রথম পর্বে খাদ্য শস্য আমদানির পরিমাণ বছরে গড়ে ১৭ লাখ টন। হাসিনা সরকারের প্রথম বছরে গড়ে প্রতি বছর আমদানি করেছিলো ২৪ লাখ টন খাদ্য শস্য।দ্বিতীয় পর্বে খালেদা সরকারের বাৎসরিক আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৭ লাখ টন। ফখরুদ্দিন-মইন ইউ আহমেদ সরকারের আমলে বাৎসরিক ২৯ লাখ টন। হাসিনা সরকারের প্রথম পর্বে প্রতি ২ বছরের গড় আমদানি ৩২ লাখ টন। (অবশ্য এই আমদানির হিসাব বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য যোগ করেই),যদিও বর্তমান হাসিনা সরকার খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটাই হল দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতার প্রকৃত চিত্র। যে দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৫০ জন আর চাষযোগ্য ১৪ মিলিয়ন হেক্টর জমির মধ্যে ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর বন্যা, ৫.৫ মিলিয়ন হেক্টর খরা এবং ৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি লবণাক্ত সমস্যায় জর্জরিত এরপরও রয়েছে নদী ভাঙ্গন, নতুন আবাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার, শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য জমির ব্যবহার এবং শহর ও নগরায়ন সম্প্রসারণের ফলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রতি বছর ১.৬ ভাগ হারে কমে যাওয়া; এমন জটিল পরিস্থিতিতেও যদি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পন্যের লাভজনক মূল্য না পায় নিশ্চিতভাবে তারা এক সময় তাদের ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে তা বলাই বাহুল্য।
ধীরে ধীরে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে জনগণ ও সরকারকে এখনই কাজ করতে হবে।
০১.     আমরা সবাই জানি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রধান অন্তরায় হল সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ। এ বিষয়টি সরকার ও জনগণকেই দেখতে হবে যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্বের কয়েক দশকের তুলনায় আমাদের নাগালের মধ্যে।
০২.     এক গবেষনায় দেখা গেছে; উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কাঁচা ফসলের ২০ শতাংশ নষ্ট হয় অথচ আমাদের দেশে ২০ হতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়। অথচ এদেশে যে হারে মানুষ বাড়ছে চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ কমছে ঠিক সেই হারে। আর উৎপাদনের হার তার চাইতেও কম তারপর সংরক্ষণের অভাবে ফসল নষ্টের আশঙ্কা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহাবুব হোসেনের মতে; সীমিত ভূমিতে উদ্ভাবনি কোন পদক্ষেপ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব নয়।
০৩.     জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরেক হুমকি। প্রতিনিয়ত বন্যা, খরা,ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এক্ষেত্রে কৃষি গবেষনা জোরদার করার মাধ্যমে লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত, বন্যা খরা সহিষ্ণু, সময় নিরপেক্ষ ও স্বল্পকালিন উন্নত জাতের খাদ্য শস্যের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্থানিয়ভাবে গবেষনা বাড়াতে হবে।
০৪.     দেশিয় পেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় দূর্ভাবনার যে, বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউটের ১১৫জন বিজ্ঞানি গত দুই দশকে চলে গেছেন এবং এখনও যারা আছেন তাদের বড় একটা অংশ পদোন্নতি বঞ্চনার কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়টি আন্তরিকতার সাথে সরকারকেই দেখতে হবে (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো)। 
একটি রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্র এবং জনগণকে যেমন আন্তরিক হতে হবে তেমনি রাষ্ট্রকে কৃষক ও ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে কৃষি গবেষনা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ব্যবস্থা সমন্বয় সাধনে এবং অঞ্চল ভিত্তিক পানি সম্পদ উন্নয়নে সরকারি খাতে দক্ষতা বাড়াতে হবে; ধান ছাড়াও অন্যান্য সফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হলে ধানের ফলন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত জমি অন্য ফসলে স্থানান্তর, প্রয়োগিক গবেষনা প্রসারের মাধ্যমে অন্যান্য ফসলে উন্নতর প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সরকারি উদ্যোগে শস্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করণের অবকাঠামোর উন্নয়নের দিকে জোর দিতে হবে।
সর্বপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে চাই বড় ধরনের পরিকল্পনা, বিশাল আয়োজন এবং প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি। (যেমন দরকার হলে জনগণকে ধানের পাশাপাশি অন্য খাবারে মনোনিবেশ করা।)
পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয় তা হল মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে দেশের সমৃদ্ধি আনলেও সমৃদ্ধি আসেনি এখনও কৃষকের ঘরে।কৃষকরা উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও অধিকাংশ সময়েই তারা লাভজনক মূল্য হতে বঞ্চিত হয়েছে ফলে তারা অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে প্রতিনিয়ত ঋণ দায়গ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশা। খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দানকারি এই কৃষকদের বঞ্চনা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ কখনোই সম্ভব নয়।        

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখঃ ১৮ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪




দয়া করে শতভাগ পাশের লাগাম টেনে ধরুন

দয়া করে শতভাগ পাশের লাগাম টেনে ধরুন


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন “আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিব” বিখ্যাত এই উক্তিটির মর্মার্থ নিঃসন্দেহে শিক্ষা গ্রহনেরই তাগিদ। শিক্ষা জাতির উন্নতির পূর্ব শর্ত। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এগিয়ে যায়; উন্নতির শীর্ষে আরোহন করে। জীবনের পথে শত বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে; জীবনের সাফল্যের দ্বার প্রান্তে যাওয়ার সিঁড়িই হল শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে যোগ্য করে তোলে। নিজের জীবনকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশেষ করে বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত কমবেশি নিরক্ষরতা দূরীকরন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূিচ, উপবৃত্তি প্রদান, স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক ব্যবস্থা শুধুমাত্র শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বপ্নে।  এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে সরকার প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এভাবেই তো ৪৫টি বছর কেটে গেল। আর কতদিন! এভাবে আমাদের সরকারকে ভূর্তুকি দিতে হবে,এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ কর্মসূচি কতটুকুইবা আলোর মুখ দেখেছে তা বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় এসে গেছে বলে মনে করি।
আমাদের দেশে ৩ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। 1) ইংরেজি মিডিয়াম (উচ্চ বিত্তদের জন্য) 2) সাধারন শিক্ষা (মধ্যবিত্তদের জন্য) 3) মাদ্রাসা শিক্ষা (নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রদের জন্য)। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে একই সাথে তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বেশ বেমানান। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে তিন ক্যাটাগরিতে লেখাপড়া করার কারনে তাদের মধ্যে চিন্তা চেতনা ভাবাবেগের বিস্তর ফারাক (ব্যবধান) তৈরি হয়। এটা কখনই দেশের জন্য শুভকর নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটের নিরিখে একটি উদাহরন দেয়া যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে পাকিন্তান ও ভারত নামক দুই দেশের জন্ম। পৃথিবীতে এমনকি কোন দেশ আছে যা শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে জন্ম হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের কারনে পাকিন্তান এবং আমাদের বাংলাদেশ (সাবেক পূর্ব পাকিন্তান)। অথচ দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, মুসলমান প্রধান অঞ্চল হিসাবে ভাগ করে নেওয়ার পরও আজ প্রশ্ন উঠেছে আস্তিক ও নান্তিকতার। (বর্তমানে এই দেশে ৯০ভাগ মুসলমানের বাস) আমার লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। আমি শুধু এতটুকুই জানাতে চাইছি যে, তিন ক্যাটাগরির শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল।

যাক এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। গত ১ দশক হতে লক্ষ্য করছি দেশে যেন শতভাগ পাশের হাওয়া লেগেছে। অবশ্য শতভাগ পাশে যেমন শিক্ষার্থীরা খুশি, তেমন অবিভাবক খুশি, আমাদের সরকারও খুশিতে আত্মহারা। আত্মহারা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত থাকার কারনে আমিও খুশি; তবে খুশিতে আত্মহারা নই। আমার খুশিটা শীতকালে ঠোঁট ফাটার ভয়ে মানুষ যেভাবে হাসে ঠিক তেমনি। আর আমার খুশি না হয়েও উপায় নেই এজন্য যে, প্রতিষ্ঠানে শতভাগের
তকমা না লাগলে প্রতিষ্ঠান প্রধান, ম্যানেজিং কমিটি সহ সরকারের পক্ষ থেকে রুটি রুজির হুমকি। সবাই যেন, ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেল সঙ্গীত বাংলার ১০০% লাভ লাভ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
আমার এই লেখা পড়ে হয়তো ভাববেন আমি শিক্ষার্থীদের ঈর্ষনীয় সাফল্যের (শতভাগ) বিরোধি। কথাটা মোটেও সঠিক নয়। আমিও চাই শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শিখে প্রকৃত মানুষ হয়ে আমাদের এই অভাগা জন্মভূমির হাল শক্ত হাতে ধরুক। শুধুমাত্র সস্তা বাহবা কুড়ানো শতভাগ পাশ নয়; আমি চাই সমানসম্মত শতভাগ পাশ। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির শুরুতে এ প্লাস / গোল্ডেন এ প্লাস  পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। তা বর্তমানে বেড়ে হাজার পেরিয়ে সংখ্যায় লক্ষ এর দ্বার প্রান্তে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের ফসল তাদের পরীক্ষার ফল। কিন্তু যে পদ্ধতিতে মূল্যায়ন তা নিয়ে আমি সংশয় এড়াতে পারি না। পরীক্ষা কি আজকাল মেধার মূল্যায়ন করে? নাকি কে কত পরীক্ষার খাতার পাতা ভর্তিতে পারদর্শি তা যাচাই করে? তৃনমূল পর্যায়ের একজন শিক্ষক হিসাবে আমার জানতে ইচ্ছা করে হাজার হাজার শিক্ষার্থি সকল বিষয়ে কি তারা সমানভাবে পারদর্শি? এটা কেমন করে হয়!
উপমহাদেশের কিংবদন্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব, হুমায়ুন কবির, সত্যেন বোস, অমর্ত্য সেন, নূরউল ইসলাম, চঞ্চল মজুমদার উনারা কেউই সব বিষয়ে ৮০’র উপরে নম্বর পাননি। (সূত্রঃ সনৎকুমার সাহা;কলামিষ্ট, অর্থনীতিবিদ)

আমার প্রশ্ন হল আজ এত এত ছেলেমেয়ে এই বিরল কৃতিত্ব দেখিয়ে তারপর তারা যাচ্ছে কোথায়? আজকাল প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষায় শতভাগ কিংবা কাছাকাছি পাশ দেখিয়ে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির সুফল ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই সফলতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে আমি নিশ্চিত বেরিয়ে আসবে এর ভিন্ন চিত্র। আমি আরও নিশ্চিত প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক সমাপনি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষনের ব্যবস্থা করা হলে পাশের হার
এ প্লাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যা দাবি করা হয় তা আদৌ সঠিক হবে না।
এ বিষয়ে আমি প্রাথামিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছি তা হল শিক্ষক/পরীক্ষকদের অলিখিত ভাবে নির্দেশ দেয়া হয় প্রাথমিক সেক্টরে বানান ভূল না ধরার জন্য,এবং জমি ভাগের মত অংক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে নম্বর প্রদানের জন্য। আমার জানতে ইচ্ছা করে,যে বাচ্চাগুলো সঠিক/শুদ্ধভাবে বানান, উচ্চারন করতে পারেনা বা পারবে না তারা কলেজে গিয়ে কি কলেজের শিক্ষকগন তাদের বানান ও উচ্চারন শেখাবেন? অনুরূপ কলেজ সেক্টরেও একই ঘটনা। বোর্ড হতে পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগন আনতে গেলে কর্তৃপক্ষ শুরুতেই একটি কথা বলেন,“লিবারেল হবেন”। এ বোর্ড সে বোর্ডের এত পারসেন্টেন্স আর আমাদের এত কম। এই দোহাই দিয়েই পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকগনের হাতে তুলে দেন। পূর্বে পরীক্ষার হলে শিক্ষক শিক্ষার্থির অনুপাত ছিল ১৬ঃ১, বর্তমানে তা ২০ঃ১। আবার কোন রুমের কোন শিক্ষার্থি যদি অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার হয় তবে স্ব-স্ব রুমের শিক্ষকরাও বহিষ্কার হবেন। এ হতে কি বুঝা যায়? শিক্ষকরা এমনিতেই অসহায়, এতিম সন্তানের মত। শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয় পত্রিকায় জানান দিয়ে। এ যে কি আত্মসম্মান হানিকর ব্যাপার তা আমি শিক্ষক হিসাবে কাউকে বুঝাতে পারবো না? শিক্ষকরা পরিবার পরিজন নিয়ে এমনিতেই কষ্টে থাকেন, তার উপর তারা পরীক্ষার হলে বহিষ্কার হবার ভয়ে সদা তটস্থ থাকেন। এ যেন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাঁড়ে। শিক্ষকদের এ ভাবে কোনঠাসা,অসম্মান করে কি মানসম্মত শিক্ষা আনায়ন সম্ভব। বছর দুয়েক আগে এস.এস.সি পরীক্ষার ভিজিলেজ টিমের সদস্য হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সৃজনশীল অংশ দেখলাম, তারপর নৈর্ব্যক্তিক অংশ। নৈর্ব্যক্তিক অংশে কোন রুমের আর পরিবেশ রইল না। দেখে ভীষন মর্মাহত হলাম। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে শিক্ষকরা দায়িত্বগত কারনে যতটা না দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ি বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের লেলিহান শিখার মাঝে এক বালতি পানির মত শিক্ষকদের অবস্থা।
এরপর রয়েছে অতি নমনীয় মূল্যায়ন পদ্ধতি। যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অন্তঃসার শূন্য করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় নমনীয়তা প্রকটভাবে লক্ষনীয়। শিক্ষক হিসাবে আমি পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়নের ব্যাপারে পূর্বের সেই (আমাদের যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সময়ে) অবস্থায় ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছি। পূর্ন আঙ্গিঁকে না হলেও ভাবাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে যাওয়া বড়ই প্রয়োজন। তা না হলে ছেলেমেয়েরা তাদের গাফিলতিতে নয় জাতীয় অবহেলার অমার্জনীয় অপরাধে ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে শংকিত বোধ করি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞান সম্মত, গতিশীল, যুগোপযোগি ও বাস্তবমুখি করতে হলে সর্বাঙ্গেঁ প্রয়োজন মেধাবিদের উপযুক্ত বেতনভাতা ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা,এর পাশাপাশি উপবৃত্তি, অবৈতনিক ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরনের সুযোগ এমনভাবে সীমিত করা যাতে দেশ কাঙ্খিত পর্যায়ে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতই যারা শিক্ষার ব্যয় ও পাঠ্যপুস্তক ব্যয় নির্বাহে অক্ষম একমাত্র তারাই এর অন্তর্ভূক্ত থাকবে। আমাদেরকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা শুধুমাত্র শতভাগ পাশ চাই নাকি মানসম্মত পাশ চাই। বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ১৫৫৩ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে সাহিত্যিক টমাস মুরের শিরচ্ছেদের আদেশ হয়। জল্লাদ তার ধারাল তরবারি চালানোর আগে তিনি সময় চাইলেন। তারপর সযতেœ তার বাবরি চুল সরিয়ে বললেন, দেখ এগুলো যেন না কাটে। আমার কাছে মনে হয় সাহিত্যিক টমাস মুর যেমন মৃত্যুদন্ডের আদেশের সাথে রসিকতা করেছেন, তেমনি শতভাগ পাশের তকমা প্রকৃত শিক্ষার সাথে রসিকতা ছাড়া আর কিছুই না।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪

শুক্রবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

মজুরি বৈষম্যে বদরগঞ্জের শ্রমজীবি নারীরা

মজুরি বৈষম্যে বদরগঞ্জের শ্রমজীবি নারীরা


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
হাতে মেহেদি মাথায় ঘোমটা আর শাঁখা সিধুর দিয়ে যে নারীরা স্বামির বাড়িতে পা রেখেছিলেন তারা এখন অভাবের তাড়না আর আর্থিক সচ্ছলতার নিমিত্তে পুরুষের পাশাপাশি শ্রম বিক্রিতে নেমে পড়েছেন বদরগঞ্জের শ্রমজীবি নারীরা। কাকডাকা ভোরে হাতে ঝুড়ি এবং কাঁধে কোদাল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন তারা। এ সমস্ত শ্রমজীবি মহিলারা রাস্তাভরাট,ইটভাটা,দালানকোটা নির্মান কাজে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক লোকের সমাগম কিন্তু তাতে মহিলা শ্রমিকদের মাঝে বিন্দুমাত্রও সংকোচ নেই। শ্রমবাজার নামে পরিচিত বদরগঞ্জ প্লাটফর্ম,ননি গোপালের মোড়, সিও বাজার মোড়,১৩ নং রেলগেট এলাকায় কাকডাকা ভোরে এলেই এদের সহজেই চোখে পড়ে। এ সমস্ত শ্রমজীবি নারীরা আবার বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত। প্রতিটি দলেই একজন করে দলনেত্রি থাকে। দলনেত্রি সুরবালা(৪৮) জানান ;এ উপার্জনেই চলে তার সংসার। সংসারে উপযুক্ত কোন ব্যক্তি না থাকায় বাধ্য হয়ে মাথায় ঝুড়ি ও হাতে কোদাল ধরতে হয়েছে। তিনি আরও জানান; পুরুষরা তাদের ভিন্ন চোখে দেখে,কিন্তু যখন না খেয়ে দিন কাটাতে হয় তখন তো কেউ খাবার নিয়ে আসে না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তায় মাটির কাজ সহ অন্যান্য কাজও সমানতালে করে যাচ্ছি। কৃষি শ্রমিক মনোয়ারা(৩৭)জানান;যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা ৪৫০ টাকা পায় সেখানে আমাদের ২২০-২৫০টাকা মজুরি দেয়। এরপরও  আমরা কাজ করি।
শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা বদরগঞ্জ কলেজ শিক্ষক কল্যান সমিতির সাধারন সম্পাদক প্রভাষক আঃ সালামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন; এ এলাকার মহিলারা পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্রমিকের কাজ করে, পাশাপাশি মহিলারা পুরুষের তুলনায় বেশ ভাল কাজ করে তবুও তাদের মজুরি কম। তাদের এই মজুরি বৈষম্য দূর হওয়া উচিত।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪


“উত্তরাঞ্চলের নীরব ঘাতক গলগন্ড”

                  “উত্তরাঞ্চলের নীরব ঘাতক গলগন্ড”


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

প্রবাদ আছে “জাতের মেয়ে কালো ভালো; নদীর পানি ঘোলাও ভালো”। এলাকা ভিত্তিক এই প্রবাদটি সত্য বলে প্রমানিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রবাদটির তাৎপর্য বাস্তবতার চরম কষাঘাতে অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে তখন মানুষ ভূলে যায় এর মমার্থ।
নীলফামারি ডোমারের এক অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দূর হতে শুশ্রি সুন্দরি মেয়েকে দেখে অবাক হলাম। এই মেয়ের নাকি বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। এ জন্য আত্বীয়ের বাড়ির সবার মন ভীষন খারাপ। খারাপ হওয়ারই কথা। ভাবলাম মেয়ের অন্য কোন সমস্যা আছে তাই হয়তো বিয়ে হচ্ছে না। পরে দেখলাম এবং জানলাম মেয়ের গলায় ছোট ঘ্যাগ বা গলগন্ড এ জন্যই তার আর বিয়ে হচ্ছে না। এটি হল উত্তরাঞ্চলের একটি পরিবারের চিত্র। একটু কষ্ট করে চোখ মেলে তাকালে উত্তরাঞ্চলের এমন অসংখ্য বেদনাদায়ক চিত্র চোখে পড়বে।
গলগন্ড কি?
সহজ কথায় পুরুষ মহিলা বা ছেলে মেয়েদের গলায় একটি বাড়তি মাংস পিন্ডের মতো দেখা যায় একে গলগন্ড বা ঘ্যাগ বলে। গলগন্ড বা ঘ্যাগ হচ্ছে স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বড় হয়ে যাওয়া থাইরয়েড গ্ল্যান্ড। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড আমাদের গলার দু পাশে প্রজাপতির মতো ছড়িয়ে রয়েছে। শরীরে আয়োডিনের পরিমান কমে গেলে যথেষ্ট পরিমান থাইরক্সিন হরমোন তৈরি হয় না। তখন এই অভাব পূরনের লক্ষ্যে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড অতিরিক্ত কাজ করে। ফলে গ্ল্যান্ড বড় হয়ে যায়। কখনো কখনো এই বাড়তি মাংস পিন্ড বড় হয়ে ঝুলে পড়ে; আবার কখনো কখনো এত ছোট থাকে যে সহজে চোখে পড়ে না। বাংলাদেশে সব অঞ্চলে গলগন্ড দেখা যায় তবে উত্তরাঞ্চলে এর প্রকোপ সবচাইতে বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক জরিপ হতে দেখা যায় যে, দেশের ৭০% মানুষের মধ্যে আয়োডিনের অভাব রয়েছে। ১কোটি মানুষ দৃশ্যমান ও প্রায় ৫কোটি মানুষ অদৃশ্যমান গলগন্ড রোগে আক্রান্ত এবং প্রায় ৭লক্ষ মানুষ মারাত্মক শারিরীক ও মানষিক প্রতিবন্ধি।
আয়োডিন এ রোগে কি ভূমিকা রাখে?
আয়োডিন হল এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ। যা শরীরে থাইরক্সিন হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের মাধ্যমে থাইরক্সিন হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন হয়। শরীরের তাপ ও শক্তি রক্ষনাবেক্ষন করার ক্ষেত্রেও  থাইরক্সিন হরমোনের গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রয়েছে। আয়োডিন প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও পানিতে পাওয়া যায়। যেসব উদ্ভিদ ও প্রানি মাটি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমেও আয়োডিন পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতি বছর বৃষ্টিপাত ও বন্যার ফলে মাটি হতে এই আয়োডিন ধুয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের খাদ্যে আযোডিনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যেসব অঞ্চলে মাটি, পানি, শাক-সবজি ও অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যে আয়োডিনের ঘাটতি থাকে সেসব জায়গাতে গলগন্ড রোগ বেশি দেখা যায়।
কারনঃ
গলগন্ড রোগের জন্য খাবারে আয়োডিনের অভাব প্রধান কারন। এছাড়াও কিছু কিছু খাবার আয়োডিন শোষনে বাধা দেয় যেমন মিষ্টি আলু, পোঁয়াজ, বাধাকপি ইত্যাদি। অবশ্য সুমুদ্র পৃষ্ঠ হতে দুরত্ব যত বাড়ে সে অঞ্চলের মাটিতে আয়োডিনের অভাব তত বেশি দেখা যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে কিশোর বয়সে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের আক্রান্ত হবার সম্ভবনা বেশি। এই অবস্থায় শরীরে অবসাদ, ঘুম ঘুম ভাব, চামড়া খসখসে হওয়া ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা নষ্ট হওয়া, কজে অনীহা দেখা দেওয়া, উদ্যম কমে যাওয়া।
বারডেম হাসপাতালের এন্ডক্রাইনোলজি বিভাগের ডাঃ শাহজাদা সেলিমের মতে-আয়োডিনের অভাবে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়। ফলশ্রুতিতে ঠান্ডা সহ্য করার অক্ষমতা, অনিদ্রা, চামড়া শুষ্ক হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রজনন সমস্যাঃ
আয়োডিনের খুব বেশি অভাব দেখা দিলে গর্ভপাত, মৃতসন্তান প্রসব কিংবা অপরিনত শিশুর জন্ম হতে পারে। এই সন্তান বেঁচে থাকলেও জন্মগত নানা সমস্যায় ভোগে।
শিশু মৃত্যুঃ
আয়োডিনের অভাব গ্রস্থ শিশুরা অন্যান্য শিশুদের চেয়ে বেশি মাত্রায় অপুষ্টি জনিত সমস্যায় ভোগে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
আয়োডিনের এই ঘাটতি জনিত সমস্যা দূর করার জন্য আমাদের অবশ্যই দৈনিক খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমান আয়োডিন গ্রহনের মাধ্যমে বিশেষ করে আয়োডিনযুক্ত লবন গ্রহনের মাধ্যমে গলগন্ড এবং আয়োডিনের অভাব জনিত সমস্যা দুর করা সম্ভব। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ, দুধ, শাক-সবজি ও ফল-মূলে প্রচুর পরিমানে আয়োডিন থাকে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল আমাদের দেশে অসংখ্য লবন কোম্পানি আয়োডিনযুক্ত লবন বলে বাজারজাত করছে- কিন্তু বেশীরভাগ লবন কোম্পানির লবনে আয়োডিন নেই।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার ( বিসিক) হিসাব অনুযায়ি দেশে ২৭২টি কোম্পানি আয়োডিনযুক্ত লবন উৎপাদন করছে। তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে বাজারের লবন কোম্পানিগুলোর ৯৫ভাগ লবনেই আয়োডিন নেই।
এমতাবস্থায় আমাদের আয়োডিনের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং ঘরে বসেই আয়োডিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যেমনঃ ভাতের সাথে লবন মিশিয়ে দিয়ে তাতে সামান্য কয়েকফোঁটা লেবুর রস দিলে যদি ভাতের রং বেগুনি হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে লবনে আয়োডিন আছে। স্মরন রাখা প্রয়োজন, আয়োডিনযুক্ত লবনের গুনগত মান ধরে রাখতে অধিক তাপমাত্রা ও স্যাঁতস্যাতে স্থান থেকে দূরে রাখতে হবে।
মোট কথা কোন রোগকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই; এই গলগন্ড হতে অনেক সময় টিউমার ও ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। অতএব “সময় থাকতেই সাবধান”।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭ডিসেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


সফল চাষি বদরগঞ্জের মোহসেন আলি

                                      বাউন্ডিলে দূর্নাম ঘূঁচিয়ে এখন
                     সফল চাষি বদরগঞ্জের মোহসেন আলি



কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
বছর দশেক আগেও যে ছিল বাউন্ডিলে,কাজ কর্মে যার ছিলনা কোন আন্তরিকতা। সকাল সন্ধ্যা যে শুধু আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতো;দশ বছরের ব্যবধানে এই আড্ডাবাজ মানুষটি এখন সফল চাষি। কিন্তু কি ভাবে সম্ভব?
সরেজমিনে জমিতে গিয়ে কথা হয় বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউপির ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের মোহসেন আলির (৩৪) সাথে, তিনি জানান; এস.এস.সি পাশের পর রংপুর পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে ঐ সময়ে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট হতে একেবারেই চলে আসেন। তখন বাবা মা ভাই বোন সহ সবারই চোখের বালিতে পরিণত হন তিনি। এরই মধ্যে বাবা মারা যায়। আরও বেকায়দায় পড়ে যান তিনি। আগেই বোনদের বিয়ে হয় ভাইয়েরাও একে একে সবাই আলাদা হয়। স্ত্রী সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়ে যান তিনি। অবশ্য বাবা মারা যাওয়ার আগে ছোট ছেলে হিসেবে তাকে দিয়ে যান ১২ বিঘা জমি। এর মধ্যে কিছু ধানি জমি নিজে এবং বাকি জমি বর্গা দিয়ে কোন রকমে দিনযাপন করতেন। এমনিতেই তুলনামূলকভাবে ধানের দাম কম এবং কৃষি উপকরনের দাম বেশি হওয়ার কারনে তার সংসারে কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। এক আত্মীয়ের পরামর্শে উচু একবিঘা(৬০শতাংশ)জমিতেই(কিছু অংশ করে)
আলু,পটল,ভুট্টা,মরিচ,টমেটো,লাউ,শসা,পালাক্রমে চাষাবাদ শুরু করেন। এভাবেই শুরু হয় তার নতুন জীবনের গল্প। তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এই দশ বছরের ব্যবধানে পাকাবাড়ি, মোটরসাইকেল, জমি কেনা ,মাছের চাষ,গরুর খামার সহ অনেক কিছু করেছেন। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান;প্রতি বছর এই এক বিঘা জমি হতে পালাক্রমে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষাবাদ করে দেড় হতে দুই লাখ টাকা আয় করেন। তিনি আরও জানান, যাদের সামান্য কিছু জমি আছে তা দিয়েই অনেক আয় করা সম্ভব। বেকার জীবন খুবই কষ্টের এবং অসম্মানের। গ্রামের বেকার যুবকদের তিনি এই পরামর্শই দিয়ে যাচ্ছেন।
বদরগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় জানান; মোহসেনের মত শিক্ষিত বেকাররা যদি বেকার না থেকে যুগপোযুগি আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন তাহলে দেশের কৃষিখাতে বিপ্লব সংঘটিত হবে। উপজেলায় মোহসেনের মত অনেক কৃষক এখন এ ধরনের ফসল চাষাবাদ করে আর্থিক ভাবে সচ্ছল হচ্ছেন।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখঃ ১৬ডিসেম্বর/১৬
মোবাইলঃ ০১৭১৭৮৫০৯৬৪

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...