শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৬

নামেই যুগীপাড়া কিন্তু যুগী নাই


পেশার সাথে ধর্ম পরিবর্তন  
নামেই যুগীপাড়া কিন্তু যুগী নাই


কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম প্রান্তে ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন গ্রামটির নাম যুগীপাড়া। এখানে দেড় শতাধিক পরিবারের বাস। পেশা ঝিনুক দিয়ে তৈরি চুন উৎপাদন। বাপ-দাদা পূর্বপুরুষের এই পেশার সাথে এক সময় তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বর্তমানে একটি পরিবার ছাড়া কেউই আর এ পেশার সাথে জড়িত নয়। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ছানা বিক্রি(দুধের তৈরি),রিক্সা-ভ্যান, গালামালের ব্যবসা, ঢাকার বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করছেন। এ গ্রামের মানুষরা জীবন-জীবিকার তাগিদে শুধু পূর্বপুরুষের পেশাই বদল করেননি, বদল করেছেন ধর্মও। অর্থ্যাৎ অনেক হিন্দু পরিবার ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহন করেছেন। অবশ্য তাদের এ প্রজন্মের ছেলেরাও আর যুগীচুন ব্যবসার সাথে জড়াতে চান না ।
উপমহাদেশের মানুষ কখন হতে পান-সুপারি খাওয়া শুরু করেছেন তার সঠিক দিনক্ষন জানা না গেলেও এখন পর্যন্ত চলছে পান এবং পান-সুপারির অতি গুরুত্বপূর্ন উপাদান চুনের ব্যবহার ।  পানের এই প্রয়োজনীয় উপাদান চুন তথা যুগীচুনের দাপট ও কদর এতটাই ছিল যে,যুগীচুন ব্যবসায়ীরা দম ফেলার মত সময় পেত না। দিন পাল্টেছে। আধুনিক ও কৃত্রিমতার এ যুগে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি করা যুগীদের যুগীচুন যেন বিলীন হতে চলেছে আর যতটুকুই অবশিষ্ট আছে তাও যেন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
গতকাল শুক্রবার (২৫নভেম্বর)সকালে কথা হয় যুগীপাড়ার প্রবীন ও যুগীচুন শিল্পের সাথে একমাত্র জড়িত ব্যক্তি  বিপিন দেবনাথের (৮৫) সাথে,তিনি জানান; যুগীচুন আমাদের বাপ-দাদা সহ তারও আগের ব্যবস্।া এক সময় খুব ভাল ব্যবসা হত,তখন নদীতে প্রচুর ঝিনুক পাওয়া যেত, জ্বালানীর সংকট ছিলনা, পাথুরে চুন বাজারে ছিলনা। বর্তমানে নদীতে পানি নেই ফলে ঝিনুক পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও বড় বড় নদী থেকে লোক মারফত ঝিনুক কিনে আনতে হয় এতে খরচও বেড়ে যায়, এর পর জ্বালানী সংকটতো আছেই। বাজারে পাথুরে চুনের দাপটে আমাদের এই যুগীচুন ব্যবসা আর নেই। তিনি আরও বলেন এই যুগীপাড়ার সবারই বাপ-দাদা যুগীচুন ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। এখন ব্যবসা না চলার কারনে বিভিন্ন ধরনের পেশার সাথে তারা জড়িয়ে পড়েছেন । আমার দুই ছেলে এক জন গালামালের ব্যবসা অন্যজন কৃষিকাজ করে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন; শরীরের জন্য উপকারি যুগীচুন শিল্পটিকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি, তাই এ শিল্পটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।এই পাড়ার অনেক পরিবার অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারনে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহন করে এখানকার চার্চে কাজ করছে। অবশ্য বর্তমানে আমাদের ছেলে মেয়েরা আমাদের যুগী বলুক এটাও তারা চায় না। তবে আমি যত দিন বেঁচে আছি ততদিন বাপ দাদার এ পেশা কষ্ট করে হলেও চালিয়ে যাব।
যুগীচুন সম্পর্কে কথা হয় বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের রসায়ন বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ইউনুস আলির সাথে,তিনি জানান; চুন মূলতঃ ক্যালসিয়াম কার্বনেট। ক্যালসিয়াম কার্বনেট তাপের (হিট) মাধ্যমে ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও কার্বনডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে। এই ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও পানি বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড বা কলি চুন উৎপন্ন করে। কলি চুন (ক্যালসিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড) পাকস্থলির হাইড্রোজেন ক্লোরাইডের (প্রতিনিয়ত একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর আমাদের পাকস্থলিতে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড তৈরি হয়)  সাথে প্রশমন বিক্রিয়ার মাধ্যমে লবন ও পানি উৎপন্ন করে ফলে আমাদের গ্যাষ্টিকের উপসম হয়। এছাড়াও যুগীচুনে প্রাকৃতিক অন্যান্য উপাদান থাকে যেমন ফসফরাস, অল্প পরিমানে সালফার, সিলিকন যা আমাদের শরীরের জন্য উপকারি। আর বাজারের পাথুরে চুনে প্রাকৃতিক কোন উপাদান তো থাকেই না বরং শরীরের জন্য ক্ষতিকর কার্বনডাই অক্সাইড তৈরি করে।
বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মনোয়ারা বেগম মোবাইল ফোনে জানান; পাথুরে চুন পানের সাথে খেলে পেটে পাথর,গ্যাষ্টিক সহ নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-২৫নভেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...