ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সামান্যতম সচেতন নয় বদরগঞ্জের কৃষকরা
পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া জীবের অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন। পৃথিবীতে৩ভাগ জল হলেও পানির বড় অংশটি হল লবনাক্ত পানি আর সামান্য অংশ হল স্বাদু পানি বা পেয় পানি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে,সারা বিশ্বের জীবকূল এই স্বাদু পানি বা পেয় পানির উপর নির্ভরশীল। এখন জানতে হবে এই স্বাদু পানির উৎস কি? মূলতঃ নদী নালা খাল-বিল ডোবা জলাশয় এবং ভূগর্ভস্থ পানি।
আমাদের নিজেদের জন্য হলেও পরিস্কার ধারনা থাকতে হবে পৃথিবীর মোট পানির আয়তন ৩২৬,০৭৪,৪০০ঘন মাইল। এর মধ্যে লবনাক্ত পানির পরিমান ৯৭.২ভাগ, আর স্বাদু পানির পরিমান ২.৭৯২ভাগ। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমান মাত্র ০.৬৩৫ভাগ। অর্থাৎ সাড়ে সাতানব্বই ভাগ পানি লবনাক্ত আর বাকি আড়াই ভাগ হল স্বাদু পানি। আর এ কারনে সামান্যতম এই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের ভাবতে হবে। সবাই জানি আমরা ভাটির দেশ। ইতোমধ্যে আমাদের স্বাদু পানির মূল উৎস বড় বড় নদীতে প্রতিবেশি দেশ ভারত একতরফা বাঁধ নির্মান করে নদীগুলিকে মেরে ফেলেছে। নদীগুলো আজ মৃত প্রায় । এ কারনে বেড়েই চলেছে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার।
সরেজমিন এই প্রতিবেদক উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ঘুরে কথা বলেছেন প্রান্তিক কৃষকদের সাথে। তাদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার সম্পর্কে । কিন্তু এ বিষয়ে তারা তেমন কিছুই জানেন না। তাদের সাফ কথা ফসল ফলানোর জন্য আমরা পানি উঠাই আর জমিতে পানি দেই।
কথা হয় মধুপুর ইউপির নাওপাড়া গ্রামের কৃষক মোকছেদুল হকের সাথে তিনি জানান; জমিত পানি না থাকলে এমনিতেই মাথা ঘোরে কখন ভাবমো ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার সম্পর্কে। যখন ভূঁই উছলি যায় তখন মটার বন্ধ করি। ভূঁয়োত তো বেশি বেশি পানি দিবার নাগবে।
কথা হয় কালুপাড়া ইউপির শংকরপুর ঝাড়পাড়া গ্রামের কৃষক মাহবুব সরকার দ্বীপের সাথে তিনি জানান;ভূ-গর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে শুধু আমরা বদরগঞ্জের কৃষকরা কেন বাংলাদেশের কোন কৃষকই তেমন ভাবে জানে না। সত্যি কথা বলতে কি ফসল উৎপাদনের জন্য পানির দরকার পানি দেই। এর বেশি কিছু আমি জানি না।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক কামরুজ্জামান মুক্তা জানান;আমাদের মনে রাখতে ভূ-গর্ভস্থ পানি অফুরন্ত নয়। এর ব্যবহার সঠিকভাবে করতে না পারলে এক সময় পানির অভাব কিংবা ঘাটতিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। এমনিতেই ফারাক্কার কারনে গোটা উত্তরাঞ্চল এবং টিপাইমুখ বাধেঁর কারনে গোটা দক্ষিন পুর্বাঞ্চলে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এটি পুষিয়ে উঠা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে। এর মধ্যে যদি আমারা আমাদের ভূ-গর্ভস্থ পানি সম্পদকে অবচেতন মনে অযথাই অপচয় করি ভেবে দেখুন কি হবে ? জমিতে যতটুকু পানির প্রয়োজন হবে ততটুকুই উত্তোলন করে কিংবা বিকল্প উৎস হতে সংগ্রহ করে হলেও এর অপচয় রোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের মানুষ তথা কৃষক সমাজকে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। ভাবতে হবে এ সম্পদ আমাদের সকলের এবং দেশের। এ বিষয়ে কৃষি বিভাগ তথা কৃষি অধিদপ্তরকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কৃষকদের সাথে কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে মিলে মিশে কাজ করতে হবে এবং বুঝাতেই হবে যে এ সম্পদ অফুরন্ত নয়।
তিনি আরও জানান; কৃষকদের এও বুঝাতে হবে যে,বেশি বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর যেমন নিচে চলে যায় তেমনি তাতে আর্সেনিকের ঝুঁকিও বাড়ে। ইতোমধ্যে দেশের কিছু জেলায় ফসলে ক্ষতিকর ক্যাডমিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এটা মূলতঃ বেশি বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কূফল।
সময় ফুরিয়ে ফুরিয়ে যাবার আগেই এখনই সবাইকে তথা কৃষকদের সচেতনতা জরুরি।
বদরগঞ্জ উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক রায় জানান; ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষিত কিছু কৃষক জানে বাকিরা জানে না। আমরা কৃষকদের সব সময় পরামর্শ দেই ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার তারা যেন না করেন। এ কারনে আমরা কৃষকদের ইরি চাষ কমিয়ে দিয়ে তারা যেন ভুট্টা গম সহ অন্যান্য ফসলে বেশি মনোযোগি হয়। এতে একদিকে যেমন ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমবে অন্যদিকে অন্যান্য ফসল ফলিয়ে তারা লাভবানও হতে পারেন।
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহবুবর রহমান মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকে জানান;আমার সকল উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন কৃষকদের বুঝান যে ভূ-গর্ভস্থ পানি অফুরন্ত নয়। এর অপচয় করা যাবে না। এ বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই যদি কৃষকরা আন্তরিক হন তবেই ভ-গর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ সম্ভব। (চলবে)
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৯ নভেম্বর/১৬
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন