শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮

সংরক্ষন জরুরি, বদরগঞ্জে বিলুপ্তির পথে প্রাকৃতিক কলার গাছ




কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

রংপুর বদরগঞ্জের কৃষকরা ধান পাট তথা অর্থকরি ফসলের পাশাপাশি সবজি চাষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। কারন অর্থকরি ফসলে অনেক সময় কৃষক লাভজনক মুল্য না পেলেও সবজি চাষে লোকসানের ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে সবজির চাষ।
উৎপাদিত এই সবজি বাজারজাত করনের সময় সবজি জাতীয় ফসলকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো কলাগাছ(বিচি কলা)।
এইসব প্রাকৃতিক কলা গাছের ছাল-বাকল দিয়ে সবজি ব্যবসায়িরা তৈরি করছেন সবজি বহনের জন্য বিশেষ ধরনের ঝুরি। যা সবজি বহনে ও সুক্ষায় বিশেষ ভুমিকা রাখছে। এর ফলে দিন দিন গ্রামাঞ্চল হতে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো কলাগাছ(বিচি কলা)।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়,মাঠের পর মাঠ নানা ধরনের সবজির চাষ। কৃষকরা তাদের জমি হতে তরতাজা সবজি তোলার পর এক জায়গায় স্তুপ করে রাখছেন  তারপর পাইকাড়রা এসে তা কিনে নিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন। এ সময় দেখা গেল পাইকাড়রা তাদের ক্রয়কৃত সবজি পরিবহনের ক্ষেত্রে চটের বস্তার পরিবর্তে ব্যবহার করছে কলা গাছের ছাল-বাকল।
কথা হয় লোহানিপাড়া ইউপির সবজি চাষি সাজু মিয়ার(৪০)সাথে, তিনি জানান; চলতি মৌসুমে ৬ বিঘা জমিতে তিনি ফুলকপি, বেগুন, ঝিঁঙ্গা, শিম ও পেঁপে জাতের সবজি চাষাবাদ করেছেন। সপ্তাহে ৩দিন করে ক্ষেতের সবজি তুলে ট্রাক যোগে ঢাকায় পাঠাতেন।
তিনি আরও জানান; সবজি বহন করতে পাটের(চটি)বস্তার চেয়ে কলাগাছের ছাল-বাকলের তৈরি ঝুঁরি বেশ ভাল হয় এবং ওই ঝুরিতে কাঁচামাল বেশি অক্ষত থাকে। তাই প্রতি সপ্তাহে আমার ২০-২৫টি কলা গাছের প্রয়োজন হত। আমি পাশের গ্রাম হতে ৬০টাকা দরে কলাগাছ কিনে ঝুরি তৈরি করে কাঁচামাল ঢাকায় পাঠাতাম।
কালুপাড়া ইউনিয়নের সবজি চাষি লোকমান হোসেন (৩৮) জানান, এ অঞ্চলে কৃষকদের দায়িত্ব শুধু সবজি ফলানো। কিন্তু বাজারজাত করার সম্পুর্ন দায়দায়িত্ব সবজি ব্যবসায়িদের। আমাদের এই এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক সবজি বিক্রেতা রয়েছে। যারা সারাদিন ধরে কৃষকদের কাছ থেকে সবজি ক্রয় করে সন্ধ্যায় ট্রাক লোড করে রাজধানীতে নিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান,ব্যবসায়িরা আলু, বেগুন, কপি, ঝিঙ্গা, পটল, করলা, ইত্যাদি কাঁচা সবজি বহনের ক্ষেত্রে পাটের (চটি)বস্তার পরিবর্তে ব্যবহার করছে কলা গাছের ছাল-বাকলের তৈরি এক প্রকার ঝুরি। কলাগাছের তৈরি একটি বড় ঝুরিতে প্রায় ১২-১৪ মন সবজি বহন করা সম্ভব। তাছাড়াও বিচি কলার ছাল-বাকলের তৈরি ঝুরিতে বহন করা এসব সবজি সর্বদা তরতাজা থাকে।
কুতুবপুর ইউপির নাগেরহাট এলাকার কাঁচা মাল ব্যবসায়ি আসাদুল হক (৩৫), মন্সুর আলি (৪৫),শাহিন মিয়া (৪২), আজাহার আলি (৪৮) জানায়, আমরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতিদিন ৫০-৬০ টাকা দরে শতাধিক কলা গাছ ক্রয় করে তা দিয়ে সবজি বহনের জন্য বিশেষ ধরনের ঝুরি তৈরি করি। এর কারন হচ্ছে বিচি কলার ছালের তৈরি ঝুরিতে সবজি বহন করলে টাটকা সবজির গায়ে কোন প্রকার দাগ পড়েনা। পাশাপাশি সুর্যের আলো থেকেও রক্ষা পায়।    
কথা হয় প্রবীন ভেষজ চিকিৎসক কবিরাজ আব্দুল হাকিমের(৭৪) সাথে,তিনি জানান,আগের দিনের লোকজন পুরুষ লোকের মেহ ও স্ত্রী লোকের সূতিকা বাধকসহ নানা রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করতো এই কলা গাছ।
তিনি আরও জানান,মহাষৌধ হিসেবে এই প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কলাগাছের  জুড়ি মেলা ভার।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রী কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম জানান,অবহেলা আর অনাদরে বেড়ে উঠা প্রাকৃতিভাবে জন্মানো এই কলা গাছগুলি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারি ও ভেষজগুন সম্পন্ন এই প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো কলাগাছগুলিকে আমাদের প্রয়োজনেই রক্ষা করা উচিত।
তিনি জানান, দিন দিন যেভাবে এই কলাগাছটি হারিয়ে যাচ্ছে তাতে এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা একদিন জানতেই পারবে না প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো গাছটির নাম।
তিনি আরও জানান; বাড়ির আনাচে কানাচে রোপন করে এর বংশবৃদ্ধি করা সম্ভব। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা সহ সু-স্বাদু ফলটিও খেতে পারবে।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৮জানুয়ারি/১৮
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪ 
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...