কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
একান্নবর্তী পরিবার আর নেই। আধুনিক এই যুগে মানুষ নিজে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। এখন প্রতিটি মানুষ জীবনের প্রয়োজনে পরিবার পরিজন ছেড়ে কিংবা শুধুমাত্র সন্তানদের নিয়ে শহর নগরে ছোট এক কুঁঠুরিতে বসবাস করছেন। এটাই জীবন। সেখানে নেই কোন মমতা ভরা ভালবাসা নেই কোন আনন্দ। এভাবে আমরাও অভ্যস্ত হয়েছি কিংবা নিজেকে মেনে নিয়েছি সেভাবেই।
সংবাদকর্মি হিসেবে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে উপজেলা ঘুরার এক পর্যায়ে চোখে পড়ে এক বিরল দৃশ্য।
পরম মমতা ভালবাসা আর দরদ দিয়ে ভালবাসার ছোট অবুঝ শিশুটির জিদ ভাঁঙ্গাতে এক দাদা তার প্রিয় নাতিকে বাড়ি হতে কিছুটা দুরের মেঠোপথে একেবারে সাদামাটা পোষাকে পরম ¯েœহে সুপারি গাছের পাতার সম্পুর্ন অংশ(ডাল)দিয়ে গাড়ির ন্যায় টেনে তাকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করছে। এই সময়ে এমন বিরল দৃশ্য দেখে লোভ সামলাতে না পেরে মটরবাইক থামিয়ে স্থির চিত্র ধারন করি। এই বিরল দৃশ্যটি চোখে পড়ে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউপির সাহেবগঞ্জ নামক এলাকায়।
এক পর্যায়ে দাদা আলতাব হোসেন(৬৯)সাদরে আমন্ত্রন জানিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িতে গিয়ে দেখি অনেক বড় দালানের বাড়ি আর অসংখ্য ঘর। যার প্রতিটি ঘরেই আধুনিক সকল প্রকার সুযোগ সুবিধাই রয়েছে। ঘরগুলিতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আসবাবপত্র যা সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। অথচ বাড়িতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ। বাড়ি দেখে মনে হল আলতাব হোসেন বিত্তশালি অভিজাত পরিবারের সন্তান।
কথা হয় দাদা আলতাব হোসেনের সাথে,তিনি জানান; আমার ৫ছেলে ৩মেয়ে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ে সবাই চাকুরি করে। আমার অন্য ছেলে সন্তানরা ঈদের সময় আর মেয়েরা ৪-৫ বছর অন্তর বাড়িতে আসে। এখন এই বাড়িতে আমি,আমার স্ত্রী, ছোট ছেলে,বউ ও তার সস্তানকে নিয়েই থাকি। সারাদিন শুয়ে বসে আর ছোট ছেলের সন্তানকে নিয়ে আনন্দ করি। ওর যত আবদার সবকিছুই আমার কাছে। আপ্রান চেষ্টা করি ওর আবদার পুরন করতে,এতে আমারও ভীষন ভালো লাগে।
তিনি জানান; সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করতে হবে এ কারনে প্রতিটি সন্তানকে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় হতে এমএ পাশ করিয়েছি। পরে সকল সন্তান যখন চাকুরির সুবাদে নিজ নিজ পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে অবস্থান করছে তখন আমরা ভীষন একাকিত্ব অনুভব করলাম। ওই সময়টাতে এত বড় বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী। একসময় সিন্ধান্ত নেই ছোট ছেলেটি বিশ^বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করলেই নিজের কাছে রাখবো। ছেলে পাশ করে আসার পর অনেকটা জোর করে তাকে আমাদের পাশর্^বর্তী উপজেলা মিঠাপুরের এক কলেজে চাকুরির ব্যবস্থা করি।
তিনি আরও জানান; সকল সন্তানদের সাথে মোবাইল ফোনে প্রতিদিন কথা হলেও তারা তো আমাদের কাছে থাকে না। এখন অনুভব করি এই বৃদ্ধ বয়সে এত জমি(শত বিঘা) আর বাড়ি,গাড়ি দিয়ে কি হবে ? মনের মধ্যে যদি কোন আনন্দ না থাকে !
এই নাতিটাই আমার বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন। ওকে নিয়েই আমরা দুই মানুষ বেঁচে আছি,আনন্দে আছি। এ যে কি সুখ,আনন্দ,তা তোমাদের বোঝাতে পারবো না। আর তোমরাও বৃদ্ধ না হলে অনুভব করতে পারবে না।
একই এলাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক রাজ্জাক আলি জানান; আলতাব চাচা বিত্তশালি হলেও অতি সাধারন পোষাক পরিধান করতে অভ্যস্থ। সন্তানদেরও তিনি এভাবেই মানুষ করেছেন। তার প্রতিটি সন্তানও বাবার মত। একেবারে সাধামাটা। তিনি আরও জানান; চাচা একজন সহজ সরল পরোপকারি মানুষ। দুঃখের বিষয়, তার এত বড় বাড়িতে তেমন কোন মানুষই থাকে না। এক ছেলে বাড়িতে থাকলেও কলেজে চাকুরি আর ব্যস্ততার কারনে বাড়িতে কম সময় দিতে পারেন। বাড়িতে বৃদ্ধ চাচা চাচি নাতিকে নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটান। নাতিই চাচার প্রান।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-৩১ডিসেম্বর/১৭
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪












