মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৮

বদরগঞ্জে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য আলোর বাতিঘর “বাংলা স্কুল”



কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)প্রতিনিধিঃ

স্বপ্ন সবাই দেখে কিন্তু স্বপ্নটি যদি হয় দেশ গড়ার তাহলে তো কথাই নেই। সত্যিকারের স্বপ্নকে বাস্তবে রুপদান করার জন্য প্রয়োজন দৃঢ়চেতা মন আর মনোবল এর সাথে আরও প্রয়োজন কঠিন অধ্যাবসায়। তবেই একজন মানুষ তার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতে পারে। দৃঢ়চেতা মনোবল আর স্বপ্নের দেশ গড়ার অঙ্গিকার নিয়ে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে আলোর ছটা ছড়িতে দিতেই প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলা স্কুল নামে এক প্রতিষ্ঠান। যেখানে বিনাবেতনে পাঠদানের পাশাপাশি আইসিটিতে দক্ষতা সহ নৈতিক শিক্ষার উপর বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন রংপুর বদরগঞ্জের বিদেশ ফেরৎ এক যুবক রাশেদুল ইসলাম(৩৫)। সমাজে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে স্কুলটির নাম দেন বাংলা স্কুল। যা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৫সালে। ৩ বছর ধরে চলছে এর কার্যক্রম।  
সরেজমিনে গত সোমবার(১৫অক্টোবর)সকালে বদরগঞ্জ পৌরশহর হতে ১০কি.মি.দুরে দামোদরপুর ইউপির শেখপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত বাংলা স্কুলে গিয়ে কথা হয় বাংলা স্কুেলর প্রতিষ্ঠাতা রাশেদুল ইসলামের সাথে,তিনি জানান,দশ বছর আমি দেশের বাইরে ছিলাম।
বিদেশে মানুষের জীবনযাত্রা ও তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে আমার মনেও নিজ দেশে কিছু একটা করার স্বপ্ন জাগে। দেশে এসেই শুরু করি বাংলা স্কুল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। দেখতে দেখতে স্কুলটির বয়স ৩ বছর হতে চলেছে।
তিনি জানান,সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠির শিক্ষা ও জীবন মান উন্নয়নের জন্য আমার একটি ফাউন্ডেশন করার ইচ্ছেও রয়েছে। দেশ ফাউন্ডেশন নামে আমি সেটা করতে চাই। এরই প্রথম পদক্ষেপ হল আমার এই বাংলা স্কুল। আমার এই বাংলা স্কুলে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত ও স্বচ্ছল পরিবারের শিশুরাও পড়ছে। পাশাপাশি আমরা বয়স্ক নিরক্ষর ব্যক্তিদের জন্য অক্ষর জ্ঞানের ব্যবস্থা করেছি। অবশ্য তাদের ক্লাস বিকেলে নেওয়া হয়। ২২ জন নিরক্ষর বয়স্ক ব্যক্তি দিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে শতাধিক নিরক্ষর ব্যক্তিকে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি জানান,এক খন্ড জমিতে অস্থায়িভাবে স্কুলটি পরিচালিত হলেও স্কুলের পাশেই ৩৩শতাংশ জমিতে স্থায়িভাবে বাংলা স্কুলটি স্থানান্তরিত করা হবে। প্রয়োজনে আরও জমি দেয়া হবে। ইচ্ছে আছে স্কুলটিকে মাধ্যমিকে উন্নীত করার।   
বর্তমানে ৯২ জন শিশু এখানে পাঠ গ্রহন করছে। এখানকার শিক্ষকরাও সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান। এখানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ্যসূচীর বাহিরেও রয়েছে আইটি ক্লাস ও নির্মল বিনোদনের চর্চা। এই স্কুলের শিশুরা যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন দিবস। শিশুদের প্রশিক্ষন দেয়া হয় শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীতের।
বাংলা স্কুল গিয়ে আরও দেখা যায়,ফুল বাগান বেষ্টিত নির্মল ছাঁয়া ঘেরা পরিবেশে স্কুলটির অফিস ও আর রয়েছে ৪ টি শ্রেনি কক্ষ। শ্রেনি কক্ষগুলো তৈরি করা হয়েছে বাঁশের বেড়া আর উপরে টিন দিয়ে। অফিস সহ ৪টি শ্রেনি কক্ষের মেঝেই কাঁচা। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কোন বেঞ্চ নেই। শিক্ষার্থীরা মেঝেতে চট বিছিয়ে বসে পাঠ গ্রহন করছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্যান নেই কোন শ্রেনি কক্ষেই। শিক্ষকদের দাঁড়িয়ে ক্লাশ নিতে দেখা গেছে। তবুও শিক্ষার্থীরা যেন পরম আনন্দে পাঠ গ্রহন করছে।
বর্তমানে বাংলা স্কুলটিতে নার্সারি, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। শিক্ষক রয়েছেন পাঁচ জন। এখানে নিয়মিত পাঠ্যবইয়ের বাইরে কম্পিউটার ও গানের ক্লাস হয় প্রতি সপ্তাহে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা শিক্ষক। গণিত ও ইংরেজি শিক্ষার ক্লাশ নেন জাহানারা বেগম নামে এক শিক্ষিকা। বাংলা-সমাজ ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাস নেন সুফিয়া বেগম,তানিয়া আক্তার নামে এক শিক্ষিকা নেন গানের ক্লাস, আইসিটিতে শিক্ষা দেন জারমিনা বেগম এবং বিজ্ঞান বিষয়ে ক্লাস নেন আন্নাহার বেগম নামে এক শিক্ষিক। শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৫ জন শিক্ষকই অনেকটা বিনা পারিশ্রমিকেই পাঠ দিচ্ছেন বাংলা স্কুলে। মাস শেষে তাদের হাতে যা তুলে দেওয়া হয় তা একেবারেই নগন্য।
কথা হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবা(৭)র সাথে,সে জানায়, বাংলা স্কুলে সে নিয়মিত আসে। এই স্কুলে পড়তে পেরে সে খুব খুশি। একই শ্রেণির শিক্ষার্থী লিজা(৭) জানায়, তাদের পাঠ গ্রহন করতে  কোনো সমস্যা হয় না। কারন,তাদের ম্যাডামরা এতো ভালো ভাবে বুঝিয়ে দেন যে তাদের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।
দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সোয়াদ(৬) প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী সপ্তমি সহ আরও একাধিক শিক্ষার্থী বেশ আনন্দের সঙ্গে তাদের ভালো লাগার কথা এই প্রতিবেদককে জানান।
অভিভাবকরাও বাংলা স্কুলের শিক্ষার মান নিয়ে খুশি। কথা হয় লাকি বেগম নামে এক অভিভাবকের সাথে, তিনি জানান, তার ছেলে ওই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পাশ^বর্তী অন্য স্কুলের চেয়েও বাংলা স্কুলের লেখাপড়ার মান অনেক ভালো বলে তিনি তার সন্তানকে এই স্কুলে ভর্তি করেছেন।
কথা হয় বাংলা স্কুলের গানের শিক্ষিকা তানিয়া আক্তারের সাথে,তিনি জানান,আমরা বাচ্চাদের নিয়মিত পাঠ্য বইয়ের বাইরেও নির্মল বিনোদন চর্চার জন্য গানের ক্লাস নিই। শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বিনোদন অত্যন্ত জরুরি। তবে আইসিটির শিক্ষক জারমিনা জানান,স্কুলটির শ্রেনি কক্ষ বাঁশের বেড়া হওয়ায় স্কুলের আইসিটি ক্লাসের কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার বাড়িতে রাখা হয় এবং ক্লাশের সময় নিয়ে আসা হয়। এতে আমাদের কষ্ট হয়। কষ্ট করে হলেও আমরা নিয়মিত আইসিটির পাঠ দান করি।
স্কুল ছুটির পর বিকাল বেলা দুই শিক্ষিকা সুফিয়া বেগম ও তানিয়া আক্তার নিরক্ষর বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়মিত পাঠদান করেন।
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিমলেন্দু সরকার জানান,সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে আলোবর্তিকা ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলা স্কুল। স্কুলটি আমার ইউনিয়নে হওয়ায় আমি গর্বিত। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা রাশেদুল প্রশংসার দাবি রাখে। আমরাও বদরগঞ্জ উপজেলায় পশ্চাৎপদ নারীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে ১৯৯৪ সালে বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এই কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থী এখন দেশের নামকরা বিশ^বিদ্যালয় সহ দেশের বাহিরে লেখাপড়া করছে। শুধু তাই নয় এ কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থী এই কলেজ হতে বের হয়ে দেশের অনেক দায়িত্বশীল পদে থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। শুভ কামনা করছি বাংলা স্কুলের জন্য।  
দামোদরপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুল হক জানান,বিষয়টি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার শিক্ষা বান্ধব সরকার। নিরক্ষর মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও আমাদেরকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলা স্কুল তারই উদাহরন। দোয়া করি তারা একদিন সফল হবেন।

বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৬অক্টোবর/১৮
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...