কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
মুজিব বর্ষে একজন অসহায় লাখরাজি রাউথকে খুঁজতে গিয়ে সরকারের সহযোগিতায় ভাগ্যগুনে উষ্ণতা প্রদানের কাজটি পাওয়া আমার জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়া ও অর্জন বলে আমি মনে করি। কাজটি সঠিকভাবে করতে পেরে আমি ধন্য ও গর্বিত। আমি জানি,জীবনে আর কোন দিন এমন কাজ করতে পারবো কিনা সন্দেহ। আল্লাহ্ যদি আবারও সুযোগ দেয় তাহলে কাজের যাতে তিল পরিমান ভুলক্রুটি না হয় এ বিষয়ে আরও সজাগ থাকবো। আল্লাহ্ যেন আমাকে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত এমন ভাল কাজ করার সুযোগ দান করেন।
আজ হতে প্রায় এক মাস আগে পর পর চার দিন প্রচন্ড কুয়াশা আর হাঁড় কাঁপানো শীতের মধ্যে বদরগঞ্জ হতে প্রায় ১০কি.মি দুরে লাখরাজি রাউথের বাড়ি মিশনপাড়ায় সকাল ৭.৩০মিনিটের মধ্যে যাই। প্রথম ৩দিন ঐ পাড়ার কেউই আমাকে পাত্তা দিচ্ছিল না। কারন অনেক সাংবাদিক(তাদের ভাষ্যমতে) প্রায় সময় তাদের ছবি তোলে ভিডিও করে। কিন্তু কোন কাজ না হওয়ায় তাদের আমার উপর এই অনিহা। শেষ পর্যন্ত তাদের আমি আপন করতে সমর্থ হই। এখানে বলা প্রয়োজন,আমি মিশনপাড়াতে গিয়েছিলাম এ কারনে যে,তারা কিভাবে ইদুরের গর্ত হতে ধান বের করে তা ভিডিও ধারন করার জন্য। এক সময় বুঝলাম যে,তারা আমাকে আপন মনে করছে না। তবুও যখন বদরগঞ্জ হতে এতদুর এলাম তখন সিন্ধান্ত নিলাম এদের সবার সাথে আমি চা খাব। প্রথমে রাজি না হলেও পরে তারা তাদের গ্রামের এক চায়ের দোকানে আমি সহ ১৫-১৬জন মিলে চা বিস্কুট খাই। চা খাওয়ার এক পর্যায়ে আমি তাদের বলি,আপনাদের কয়েক গ্রাম পরে আমাদের গ্রামের বাড়ি। এক সময় তারা আমাকে জানায় আমার পুর্বপুরুষদের নাম। পরবর্তিতে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তারা আমার সাথে তাদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে। চা খাওয়ার সময়টাতে দেখি এক বৃদ্ধ মহিলা(লাখরাজি) ঠান্ডায় যবুথবু হয়ে ঘরের পাশে সূর্যের উষ্ণতার আশায় বসে আছেন। তখনই আমি তার ছবি তুলি।
সকাল ১০টার দিকে আমি মিশনপাড়া(লাখরাজির বাড়ি)হতে সোজা বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবে চলে আসি। আর সিন্ধান্ত নেই লাখরাজির উপর আমি প্রতিবেদন তৈরি করবো। সকাল ১১.১৫মিনিট হতে লাখরাজির উপর প্রতিবেদনটি তৈরি করতে আমার দুপুর ১.৩০মিনিট বেজে যায়। কম্পিউটারে সেভ বাটন চাপ দিয়েও কি যে হল,কম্পিউটারে লাখরাজির লেখাটি খুঁজে না পেয়ে মনের দুঃখে রুম হতে বের হয়ে যাই। জোহরের নামাজ পড়ে আবারও লেখা শুরু করি। শেষ হয় বিকাল ৩.৩০মিনিটের দিকে। তখন ভাবলাম,এত কষ্টের একটি প্রতিবেদন, সময়ও কম। নির্ধারিত সময়ের অভাবে ইত্তেফাক প্রিন্ট এ যদি নিউজটি না কভারেজ দেয়,এটি ভেবে প্রিন্ট ও অনলাইনে দুই জায়গাতেই নিউজটা পাঠিয়ে দেই। সন্ধ্যার দিকে কম্পিউটার খুলে ইত্তেফাক অনলাইন সাইডে গিয়ে দেখি নিউজটি ভাইরাল হয়ে গেছে। পরে জানতে পারি,ঐ দিন গভীর রাতে পুলিশ প্রশাসন লাখরাজির বাড়িতে গিয়ে খবর নিয়েছে। যার সুত্র ধরে রংপুরের সু-দক্ষ পুলিশ সুপার মহোদয় কম্বল সহ লাখরাজির ভরন পোষনের দায়িত্ব গ্রহন করেন। এরই মধ্যে দেশ বিদেশ হতে আমার কাছে শতাধিক ফোন আসে লাখরাজিকে সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে। পরে ত্রান ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ের সুযোগ্য প্রতিমন্ত্রি ডাঃ এনামুর রহমান মহোদয় বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের নামে ৫শত কম্বল পাঠিয়ে দেন। আমি আমার ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতা নিয়ে পৌর শহর সহ উপজেলার প্রকৃত গরীব অসহায় বৃদ্ধ মানুষের তালিকা তৈরি করি,ক্লাবের সকল সদস্যদের নির্দেশ দেই কম্বল নিতে আসা অসহায় মানুষগুলো যেন তিল পরিমান মনোকষ্ট না পায়। কম্বল নিতে এসে তাদের যেন সময়ের অপচয় না হয়। এরপর রংপুর-২ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক ভাইয়ের হাত দিয়ে কম্বল বিতরনের শুভ উদ্বোধন করি। অবশ্য আমার এই কাজে উপজেলা আওয়ামিলীগের সাধারন সম্পাদক ও বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান টুটুল চৌধুরি,উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলে রাব্বি সুইট পৌরসভার মেয়র উত্তম সাহা,উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক পলিন চৌধুরি,বদরগঞ্জ ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি সরওয়ার জাহান মানিক সহ বদরগঞ্জের সকল দায়িত্বশীল মানুষ আমার এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।
তার পর আমাদের রেজিষ্ট্রারভুক্ত(অসহায় ও বৃদ্ধ) সকলেই ক্লাবে এসে কম্বল নিয়ে যান। এর মধ্যে যারা বৃদ্ধ অসুস্থ্য এবং দুরে বাড়ি,আমি নিজ দায়িত্বে ক্লাবের সদস্যদের সহয়োগিতা নিয়ে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কম্বল দিয়ে আসি। এ কারনে আমার ক্লাবের সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
সরেজমিনে বাড়িতে যাওয়া বৃদ্ধ ও অসুস্থ্য মানুষের মধ্যে একজন হল,বদরগঞ্জের শেষ প্রান্তে সৈয়দপুর উপজেলার প্রায় কাছাকাছি গোপিনাথপুর ইউপির বুড়িরপুকুর এলাকার ১০৮ বছরের অসহায় বৃদ্ধা সারা মাই কে কম্বল দিয়ে আসি। বর্তমানে সারা মাইয়ের আপন বলতে কেউ নেই। সম্পর্কে নাতনির বাড়িতে থাকেন। ধরা যায়,অন্যের আশ্রয়ে আশ্রিত।
আর একজনের কথা আমার মনে ভীষনভাবে নাড়া দেয়, উনি হলেন,তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউপির তিন বারের সাবেক চেয়ারম্যান ও হারিয়ারকুঠি ইউপি আওয়ামিলীগের সাবেক সভাপতি কবির উদ্দিন সাহেব। যিনি এক সময় তার নিজের হাত দিয়ে শত শত মানুষকে শীতবস্ত্র দিয়েছেন। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বেলায় অনেকটা সু-চিকিৎসাহীন আর দৈনদশা নিয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন। কতোটা সৎ ও নির্ভেজাল পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হলে জীবনের শেষ বেলায় এমন অবস্থা হয় ! বর্তমানে তার নিজস্ব সম্পদ বলে কিছু নেই। তার মত মানুষকে সমাজের প্রয়োজনেই আমাদের বেঁচে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। যিনি সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে আজ নিঃস্ব। মনে মনে কষ্ট পেলেও এই মহৎপ্রান মানুষটির পায়ের ধুঁলো দোয়া আর কম্বল দিয়ে একটুখানি উষ্ণতা দিতে পেরে আমার মত একজন অতি নগন্য মানুষ গর্বিত ও ধন্য হয়েছে। আমি জানি, আমার মত একজন অতি নগন্য মানুষ তার পায়ের ধুঁলোরও যোগ্যতা রাখে না।
এটি সম্ভব হয়েছে,সকলের দোয়া ভালবাসা আর লাখরাজির মত অসহায় মানুষের প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য। এ জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রি জননেত্রি শেখ হাসিনা ও ত্রান দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রি ডাঃ এনামুর রহমান মহোদয়ের প্রতি আমি সহ বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে। সত্যিকার অর্থে এই সরকার মানবতার সরকার।
আরও কৃতজ্ঞতা জানাই রংপুরের ডিসি মহোদয়,এসপি মহোদয়,বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমান হাওলাদার মহোদয়কে।
বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাব আজন্ম মানুষের পাশে থাকবে,বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা নিয়ে এই কামনা ও প্রত্যাশা করি। আমি হয়তঃ একদিন বেঁচে থাকবো না,কিন্তু বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাব বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে। ঐ সময় যিনি বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের হাল ধরবেন(দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি) তিনিও যেন বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সবসময় মানুষের পাশে থাকেন,এই কামনাই করি। পরিশেষে সকলের দোয়া আর ভালবাসা চাই। ভুল-ক্রুটি মার্জনীয়।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-০২ফেব্রুয়ারি/২০
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন