শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৭

পেশা যাদের সাপ ধরা



কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ

বদরগঞ্জ উপজেলা সদর হতে ৭ কিঃমিঃ পর্ব-পশ্চিম কোনে রামনাথপুর ইউপির খোর্দ্দবাগবাড় গ্রাম। যেখানকার সকল মানুষই আদিবাসি এবং বসবাস করেন মাটির তৈরি কুঁড়ো ঘরে।  
সতিই আজব একটি গ্রাম। যে গ্রামের মানুষদের বসবাস সাপের সাথে। সাপ ধরাই যাদের নেশা ও পেশা। প্রায় আড়াই’শ বছর ধরে বাপ-দাদার এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন তারা। এই গ্রামের ৮০টি পরিবার সকলেই এই পেশার সাথে সরাসরি জড়িত।
হালকা পাতলা গড়নের মানুষ রাম রশি রাউথ(৬৫)। যার পেশা জীবিত সাপ ধরা। সারাদিন সাপ ধরে এবং বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোন রকমে চলে তার ৬ জনের সংসার। বাপ-দাদার পেশাও ছিল এটি। রাম রশির মত তার গ্রামের সকলেরই পেশা সাপ ধরা,এ কারনে উপজেলার মানুষরা ওই গ্রামের নাম দিয়েছে সাপের গ্রাম।
আজব গ্রাম সাপ পল্লীতে কয়েকদিন ঘুরে তাদের একত্রে না পাওয়ার কারনে একদিন তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে বিদায় নিতে হয় অন্যদিন শুধু ছবি নিয়েই ফিরতে হয়। কারন তারা ভোর বেলা বাড়ি হতে বের হয়ে আশে পাশের সকল জেলা উপজেলায় ঘুরে বেড়ায় সাপের খোঁজে। অনুরোধ করে একদিন তাদের কমবেশি সকলের একত্রে পাওয়া যায়। 
এ সময় কথা হয় সাপ ধরতে নের্তৃত্ব দেয়া রাম রশি রাউথের সাথে,তিনি জানান;সারা দিন বনে জঙ্গলে ঘুরে সাপের সন্ধান করি যে দিন সাপ ধরতে পারি সে দিন ভাল লাগে এই ভেবে দু-দিন অন্ততঃ সংসারের খরচ চলবে। আবার অনেক সময় সাপ না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তিনি আরও জানান;একেকটি সাপ সাপুড়েদের কাছে বিক্রি করেন ৪-৬শত টাকায়। আগের মত আর সাপ পাওয়া যায় না। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তেও পারছি না।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এগিয়ে আসেন সাপ পল্লীর বাসিন্দা সাহা রাউথ(৪৯)জানান; ভাই সাপ দেখবেন,বলেই তিনি তার বাড়ি হতে একটি সাপের ঝাঁপি(বক্স) নিয়ে আসেন। এরপর ঝাঁপি (বক্স)খুলে দিতেই ফোঁস করে ফনা তুলে উপরে ভেসে উঠে একটি বিষধর গোখরা। তিনি জানান;সাপ ধরা একটি কৌশলমাত্র। সাপ ধরার সময় ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যেন বিপদ না হয়।
সাপ পল্লীর অপর বাসিন্দা মিসরি রাউথ(৪৮)জানান;সাপ ধরতে গেলে বাড়ির সবাই আতঙ্কে থাকে-এই বুঝি সাপ ছোবল মারল। আমরা প্রতিনিয়ত সাপের সাথে বসবাস করি। ভয় লাগে কখন সাপ আমাদের দংশন করে। তিনি আরও জানান;সাপ ধরা কাজটি ছাড়া আমরা আর কোন শিখিনি বাধ্য হয়ে এ পেশাটিকে আঁকড়ে ধরে আছি। 
ভগরাসন রাউথ(৫১)জানান; সাপ ধরে আনার পর কিছু খায় না। এ কারণে কাঠের বাক্সের ভিতরে পানি ছিটিয়ে দেয়া হয় যাতে সাপ জিহ্বা দিয়ে পানি চেটে নিতে পারে।
নগেশ্বরি রাউথ(৪৭)জানান;বন-জঙ্গলের চিহ্নই জানান দেয় সেখানে সাপ আছে কি-না। অনেক সময় ৩-৪ দিনেও সাপের দেখা মেলে না। তখন হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়। বৃষ্টি হলে গর্ত থেকে সাপ বের হয়। বছরের প্রায় ৪-৫ মাস গর্ত থেকে সাপ বের হয় না।
সহেদুল রাউথ(৫৪)জানান;জীবন বাঁচাতে অনেক সময় জীবন বিপন্নও হয়। কেননা সাপ ধরতে গিয়ে এরই মধ্যে আমাদের গ্রামের নগেন রাউথ ও লাকু রাউথ সাপের ছোবলে মারা গেছেন।
তিনি আরও জানান;আমরা অন্য পেশার সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারছি না। কিন্তু এভাবে আর কতদিন। সাপ আর তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।কিন্তু এই পেশা ছেড়েও দিতে পারছি না। অনেকেই দিনমজুরি করেও সংসার চলছে না। তাই সাপ ধরার ডাক আসলে ঘরে বসে থাকতে পারি না। সাপ ধরে আনার চুক্তিতে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে।
বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহি অফিসার রাশেদুল হক মোবাইল ফোনে জানান; অগ্রাধিকার ভিক্তিতে তাদের কিছু সুবিধা দেয়া হচ্ছে যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। প্রানিসম্পদ বিষয়ক যে সব আইন রয়েছে সে সম্পর্কেও তাদের সচেতন করা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা যাতে প্রকাশ্যে প্রানি সম্পদ ধ্বংস করতে না পারে সে জন্য প্রশাসন সজাগ রয়েছে।
রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক জানান; সাপ ধরা পল্লীর বাসিন্দাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য যত রকম সহযোগিতা দরকার তা করা হবে।


বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-১৭নভেম্বর/১৭
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ডিউক চৌধুরি এমপিকে বদরগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের অভিনন্দন   রংপুর বদরগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল কালাম মোঃ আহসানুল হক চৌধুরি ডিউক(এমপি) তৃতীয় ...