কামরুজ্জামান মুক্তা,বদরগঞ্জ(রংপুর)ঃ
রংপুরের বদরগঞ্জসহ বাংলাদেশের কৃষকরা জীবন-জীবিকার তাগিদে ফসল উৎপাদনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কম বেশি সারা বছরই তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দেন তাদের কাঙ্খিত ফসল উৎপাদনে। খাদ্য নিশ্চিত নিরাপত্তা দানকারি কৃষকদের এই কষ্টাজিত শ্রমকে খাটো করে দেখার কোন কারন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, মাটির প্রাণ টপ সয়েল সম্পর্কে তারা কতটুকু অবগত। ফসল উৎপাদনে টপ সয়েলের ভুমিকা কতটুকু এ বিষয়ে কৃষি অফিস তথা কৃষি অধিদপ্তর কৃষকদের কি ধারনা দিয়েছেন ?
আগে জানা প্রয়োজন টপ সয়েল কি? মাটির উপরিভাগে হিউমাস সমৃদ্ধ অংশটিই হল টপ সয়েল। এই অংশটিতেই মূলতঃ উদ্ভিদের মাইক্রো ও ম্যাক্রো উপাদান বিদ্যমান। যার মাধ্যমে উদ্ভিদরা তার জীবনীশক্তি ফিরে পায় এবং দ্রুত বেড়ে উঠে।
সরেজমিনে উপজেলা ঘুরে কথা হয় রামনাথপুর ইউপির খিয়ারপাড়া গ্রামের কৃষক নওশাদ আলি(৪৩)সাথে তিনি জানান; সারা বছর হারা (আমরা) কমবেশি সউক (সব) আবাদ করি । ভূঁই চাষ করি সার দেই ফসল তুলি এইটাইতো হামার কাম। টপ সয়েল এটা ফির কি?
কথা হয় মধুপুর ইউপির কৃষক মেনাজুল ইসলাম চঞ্চল(৪৫) সাথে তিনি জানান; আমাদের মধুপুরে ইটভাটার সংখ্যা কমপক্ষে ৩৫টি। আমাদের এখানকার কমবেশি সকল কৃষক তার জমির মাটি বিক্রি করে দেয় ইটভাটার মালিকদের কাছে। অধিক মুনাফার লোভে এখানকার কৃষকরা তাদের জমির মাটি অবলীয়ায় বিক্রি করে দিচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি তেমনভাবে আমিও জানি না টপ সয়েল কি?
বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম জানান; সাধারনতঃ ভূমির দুই-আড়াই ইঞ্চি পরিমান হিউমাস সমৃদ্ধ মাটিই হল টপ সয়েল। এই মাটিতেই সকল পুষ্টিগুন তথা মাইক্রো ও ম্যাক্রো এলিম্যান্টেস থাকে। ফসলের ধরন অনুযায়ি যৎসামান্য আরর্টিফিশিয়াল (কৃত্রিম) সার প্রয়োগ করে কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন করা হয়। কৃষকরা যদি তাদের ভূমির প্রাণ ভোমরাকেই অন্যের হাতে তুলে দেয় তাহলে তাদের জমি হতে তারা কাঙ্খিত ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ হবেন।
কৃষকদের জানতে এবং বুঝতে হবে টপ সয়েল অন্যের কাছে বিক্রি করে দিলে এই ঘাটতি পূরনে তাদের লেগে যাবে ২০-২৫ বছর। আর এই সময়টাতে কৃষকরা যে ফসলই উৎপাদন করুক না কেন নিশ্চিত ভাবে বলা যায় তারা কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন করতে পারবে না। না বুঝে হোক আর বাড়তি টাকার মোহেই হোক টপ সয়েল বিক্রির প্রবনতা কৃষকদের বন্ধ করতে হবে। তা না হলে কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সন্মূখিন হবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের উপর নির্ভরশীল। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির গুনগত মান এমনিতেই নষ্ট হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে ফসলে বাদ যাচ্ছে না জীববৈচিত্রেও। এর পর যদি টপ সয়েল ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে কৃষি তথা কৃষি ব্যবস্থা যাবে কোথায় ! তাই পরিবেশ বান্ধব কৃষি এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে কৃষি অফিস তথা কৃষি বিভাগকে অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং বোঝাতে হবে টপ সয়েল সম্পর্কে। অন্যথায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন বাধাগ্রস্থ হবে।
বদরগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কনক রায় জানান; শুধুমাত্র লোভের বশবর্তী হয়েই কৃষকরা তাদের টপ সয়েল বিক্রি করে দেন। কিন্তু একবারও তারা উপলব্ধি করে না যে তারা কতবড় ক্ষতির সন্মূখিন হলেন। আমরা সবসময় কৃষকদের বোঝানোর চেষ্টা করি এবং করছি যাতে কৃষকরা তাদের জমির টপ সয়েল বিক্রি না করেন।
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহবুবর রহমান মোবাইল ফোনে জানান; টপ সয়েল রক্ষার্থে আমাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। কৃষি বিভাগের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সাথে কথা বলেন টপ সয়েল সম্পর্কে। অনেক সময় কৃষকরা তা শুনেন আবার শুনেন না। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের সচেতনতা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বদরগঞ্জ,রংপুর
তারিখ-০৩অক্টোবর/১৭
মোবাইল-০১৭১৭৮৫০৯৬৪
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন